ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথের অবহেলা ও দখলমুক্তির আকাশচুম্বী স্বপ্ন

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ২:৩৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৮, ২০২৬

দীর্ঘ ২৯ বছর ধরে বন্ধ থাকা ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথটি এখন শুধুই এক স্মৃতি হিসেবে স্মরণে রয়ে গেছে। এক সময়ের কর্মচঞ্চল এই রেললাইনটি রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, ভূ-সম্পত্তি দখল আর অবহেলার কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। অথচ যদি এই রেলপথটি পুনরায় চালু করা যায়, তবে বাংলাদেশের বৃহৎ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটাই উন্নত হতে পারে।

জানা যায়, ১৯২৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ফেনী জেলায় এক সরকারি আদেশে এই রেলপথের প্রকল্পের অনুমোদন হয়। সেই সময় স্থানীয় ২৫ গ্রাম থেকে ২৭৭ একর জমি অধিগ্রহণ করে এই ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এই রেললাইনটি ১৯২৯ সালে চালু হওয়ার পর, এটি বন্ধুয়া, দৌলতপুর, আনন্দপুর, পীরবক্স, মুন্সির হাট, ফুলগাজী, চিথলিয়া ও পরশুরামসহ মোট ৮টি স্টেশনের মাধ্যমে এলাকার মানুষের যাতায়াত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

একসময় এই রেলপথটি শিক্ষার, ব্যবসার ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল মাধ্যম ছিল। স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে সড়ক যোগাযোগের প্রসার বেড়ে গেলে রেলপথের গুরুত্ব হ্রাস পায়। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৯৭ সালের ১৭ আগস্ট রেল কর্তৃপক্ষ এই রেললাইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেয়, এবং থেকে আর বিকশিত হয়নি। এখন সব স্টেশনই পরিত্যক্ত এবং ভাঙচুরের শিকার। ভবনগুলো লতাপাতা দিয়ে ঢাকা পড়েছে, কিছু স্থান থেকে ইট ও রেলস্লিপার চুরি হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে থাকা এই রেলপথের স্টেশনগুলো এখন অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে মাদকের ব্যবসা ও বখাটেদের আড্ডা চলছে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, রেলপথের জমির বিশাল অংশ প্রভাবশালী কর্তৃপক্ষ দখল করে নানা ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করেছে। রেলপথের দুপাশে থাকা অনেক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে, যা এক সময় একটাই পর্যটন ও ব্যবসা কেন্দ্র ছিল। এ অবস্থা চলতে থাকায় কোটি কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কিছু চুরি হওয়া রেললাইন উদ্ধারও করা হলেও, মামলাগুলোর নিষ্পত্তি এখনো চলমান।

আমরা দেখতে পাই, রেলপথটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গ্যাংওয়ে ও কর্মচারী নিয়োজিত থাকলেও, রেলপথটি বন্ধ হওয়ার পরে তারা বিভিন্ন স্থানে বদলী করা হয়েছে। তবে, এই গুরুত্বপূর্ণ রেললাইনটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে ব্যাপক পরিকল্পনা চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে এই রেললাইন সংস্কার করে পুনরায় চালু হওয়া সম্ভব বলেও জানা যায়। এর মাধ্যমে তখন বিলোনিয়া স্থলবন্দর কার্যক্রম আরও জোরদার হবে, জাতীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য দ্রুততর হবে।

চট্টগ্রাম বন্দরে থেকে সরাসরি উত্তর-পূর্ব ভারতে মালামাল পরিবহণের সুবিধাও সৃষ্টি হবে। এতে ফেনীর উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাজের সুযোগ ও জনপ্রিয়তা অনেক বেড়ে যাবে। বহুবার এই রেলপথের পুনঃস্থাপনের জন্য পরিকল্পনা ও সমীক্ষা চালানো হয়েছে। তবে এখনো বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আমরা বছর বছর শুধু আশার কথাই শুনি। সরকারের উচিত দ্রুত এই রেলপথটি সংস্কার ও চালু করা, নাহলে একদিন এই রেলপথের নামই ভুলে যাবে পুরো এলাকা।

রেলওয়ে অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, জমি মুক্ত করার জন্য উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে, পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত এখনও নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে রয়েছে।

প্রেস ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই রেললাইন চালু হলে এলাকার যোগাযোগের মান উন্নত হবে এবং বিলোনिया স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রফতানিতে প্রবৃদ্ধি আসবে। বিশেষত, অর্থনৈতিক বিকাশ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য এটা অত্যন্ত জরুরি।

সাবেক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, এই লাইনটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও তা পুনরায় চালুর জন্য সরকারের পরিকল্পনা ও উদ্যোগ প্রয়োজন। ফেনী-৪ মূল্যের স্মৃতি হয়ে থাকা এই রেললাইনটির আধুনিকায়ন ও পুনঃচালুর জন্য প্রয়োজন কার্যকর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও একক প্রচেষ্টা।