রাজনৈতিক স্বস্তি ফেরলেও অর্থনীতিতে ঝুঁকি বেড়েই যাচ্ছে

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ৩:৩৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬

অক্সফোর্ড ইকোনমিকস তাদের yeni প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। তবে, এই পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকি এখনো যথেষ্ট উচ্চ। সম্প্রতি প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পরে দেশের ঝুঁকি স্কোর ০.৪ পয়েন্ট বেড়ে ৭.১ এ পৌঁছেছে, যেখানে এশিয়া–প্যাসিফিক অঞ্চলের গড় স্কোর ৫.১। অর্থাৎ, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বের ১৬৪টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের স্থান এখন ১৪১তম। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক অস্থিরতা কমিয়েছে, কিন্তু বিনিয়োগ ও ব্যবসায়ের মনোভাব পুরোপুরি ফিরতে এখনও সময় লেগে যাবে বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকস পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে ঝুঁকি মূল্যায়ন করে, যার মধ্যে রয়েছে বাজার চাহিদা, বাজার ব্যয়, বিনিময় হার, রাষ্ট্রের ঋণমান এবং বাণিজ্যঋণ। এই সূচকগুলো ১ থেকে ১০ এর মধ্যে স্কোর দেয়, যেখানে ১০ মানে সর্বোচ্চ ঝুঁকি।

বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল দিক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বাণিজ্যঋণ। এই ক্ষেত্রে স্কোর ১০, অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি এবং সীমিত তথ্যের কারণে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। ব্যাংকগুলো বড় করপোরেট এবং সেবা খাতে বেশি ঋণ দিলেও গৃহস্থালি ও আবাসন খাতে ঋণের প্রবাহ কম।

উচ্চ সুদহার ও খেলাপি ঋণের চাপের কারণে বাজারে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, যেখানে স্কোর ৮। অন্যদিকে, বাজার চাহিদার ঝুঁকি স্কোর ৭, যা আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে বেশি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, নীতিগত জটিলতা, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অনিশ্চয়তা এবং প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরতাও এই ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

বিনিময় হারেও ঝুঁকি মাঝারি—স্কোর ৫। যদিও ভাসমান বিনিময় হার চালু রয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ করছে, তবে বৃহৎ অবমূল্যায়নের পর টাকা কিছুটা স্থিতিশীল হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেলেও, এখনো তা মহামারিপূর্ব পরিস্থিতির থেকে কম। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচি চলতে থাকলে মধ্যমেয়াদে এই পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

রাষ্ট্রের ঋণমান এখনও উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, কম মাথাপিছু আয়, প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা এবং বিরিঞ্চি পরিবেশ এই সূচককে চাপে রেখেছে। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও সরকারি ঋণমানের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকস পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির দিকে এগোচ্ছে, যা পরে কমে ৪.৫ শতাংশে অবস্থান করবে। তবে, ২০২৬–২৭ সালে এই প্রবৃদ্ধির হার আবার বৃদ্ধি পেয়ে ৫.৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

মূল্যস্ফীতি এখনও বড় এক চ্যালেঞ্জ। সাময়িক কমার পর জানুয়ারিতে এটি আবার বেড়ে ৮.৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে অক্টোবরের পর্যায়ে ছিল ৮.২ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে, কিন্তু মজুরি বৃদ্ধির হার প্রায় ৮ শতাংশ হওয়ায় জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। এর ফলে ভোক্তা চাহিদা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

রপ্তানি খাত এবং বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প আবারও চাপের মুখে। গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও চতুর্থ দিকে রপ্তানি কমে গেছে। এর মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং ইউরোপে জার্মানি সহ অন্যান্য দেশের চাহিদার হ্রাস। দেশের মোট রপ্তানির প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিতে। এছাড়া, সেবা রপ্তানি কমে যাওয়া আরও সমস্যা সৃষ্টি করছে।

বহির্গমণ রবিশির আরও শক্তিশালী করার জন্য কঠোর ঋণনীতি এবং আইএমএফ এর সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর ফলস্বরূপ, গত বছরের মাঝামাঝি সময় দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার। তবে, এই রিজার্ভ দিয়ে বর্তমানে দেশের চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।

সরকারের ব্যয় সংকোচন ও উচ্চ ঋণের খরচের কারণে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি শুধুমাত্র দুর্বল থাকতে পারে। মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না আসায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার ১০ শতাংশে ধরে রাখার পরিকল্পনা করছে। জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির হার ৮.৬ শতাংশে থাকায়, দ্রুত অর্থনৈতিক স্বাভাবিকতায় ফিরতে কিছুটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।