ইসলাম আগের মধ্যপ্রাচ্যে রোজার ইতিহাস: এক ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় পর্যালোচনা

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ২:০৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬

রমজান মাসে মুসলমানরা এক মাস ধরে রোজা পালন করেন, যা ইসলাম ধর্মের পাঁচ মূল স্তম্ভের অন্যতম। তবে ইসলামের আবির্ভাবের আগে থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতায় রোজা বা উপবাসের প্রচলন ছিল। বিবিসির আরবি বিভাগের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই প্রাচীনকালীন রোজার ইতিহাস বিভিন্ন ধর্মে ও সংস্কৃতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধরে রেখেছে।

প্রথমে দেখা যাক প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার রোজার প্রথা। প্রাচীন মিশরীয়রা দেবতাদের নৈকট্য অর্জন, সন্তুষ্টি লাভ এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য নানা উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠান পালন করতেন। এর পাশাপাশি উপবাসের অভ্যাসও ছিল। তারা বসন্ত উৎসব, ফসলের উৎসব, এবং নীলনদে বর্ষাকালীন প্লাবন উৎসবের সময় উপবাস করতেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল আত্মাকে পাপ ও ত্রুটিমুক্ত করে দেবতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও কিছু মনে করেন, প্রাচীন মিশরীয় উপবাসের ধরণ কেবল পুরোহিতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আবার অনেকে মনে করেন, সাধারণ মানুষও এই প্রচলন অনুসরণ করতেন।

তাদের উপবাসের সময় সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চালানো হত। এ ধরনের উপবাসের সময়কাল তিন দিন থেকে শুরু করে ৭০ দিন পর্যন্ত হতে পারে, যেখানে খাদ্য, পানীয় ও যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকাটা জরুরি ছিল। প্রাচীন মিশরে মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তির জন্যেও উপবাসের প্রচলন ছিল। এমনকি কয়েক দিনের জন্য কেবল শাকসবজি ও পানিই গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হত।

অন্যদিকে, খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বছরেরও বেশি আগে পারস্য ও আশপাশের অঞ্চলে জরথুস্ত্রবাদ ধর্মের দেখা যায়। এই ধর্মের অনুসারীরা ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক, ইরান, ভারত, আফগানিস্তান ও আজারবাইজানসহ বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন। এই ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা জরথুস্ত্র উপবাসের বিরুদ্ধে প্রচার করেছিলেন, কারণ তার ধারণা ছিল, উপবাস মানুষেকে দুর্বল করে দেয় এবং অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ায়। তবে ইয়াজিদি ধর্মে বেশ কিছু রীতির অন্তর্ভুক্ত ছিল রোজার, যেমন তিন দিনের উপবাসের প্রচলন। ইয়াজিদিরা সূর্যrise থেকে সূর্যset পর্যন্ত এই রোজা পালন করতেন, যা তাদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মঙ্গলবার শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার শেষ হত। এই রোজা সাধারণ মানুষ ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব উভয়ের জন্য আলাদা আলাদাভাবে পালন করা হতো। শিশু, প্রতিবন্ধী বা অসুস্থ ব্যক্তিদের থেকে এই রোজা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হত, আর ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা বিশেষ শ্রেণির মানুষ দীর্ঘ দিন ধরে রোজা পালন করতেন।

অন্যদিকে, ইহুদি ধর্মে ‘ইয়োম কিপুর’ বা প্রায়শ্চিত্তের দিন রোজার বিশেষ স্থান রয়েছে। এটি বিশ্বাস করে, এই দিন নবী মুসা সিনাই থেকে তাওরাতের ফালা নিয়ে অবতরণ করেন। এই দিনটি ইহুদিদের সবচেয়ে পবিত্র দিন, যেখানে তারা পার্থিব ভোগ-বিলাস থেকে বিরত থেকে ইবাদত, আত্মসমালোচন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে দিন কাটান। এ দিন রোজা ২৬ ঘণ্টা চলে এবং অসুস্থ, গর্ভবতী বা গরিবের জন্য এর থেকে অব্যাহতি রয়েছে। এছাড়াও, নানা ধরণের স্বেচ্ছা উপবাস প্রচলিত, যার মাধ্যমে পাপের প্রায়শ্চিত্ত বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।

খ্রিষ্টধর্মে উপবাসের মূল লক্ষ্য হলো ক্ষমা প্রার্থনা ও সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য অর্জন। বাইবেলে নির্দিষ্ট কোনো সময় বা মাস উল্লেখ না থাকলেও, বিভিন্ন গির্জা ও সম্প্রদায় নিজেদের অনুসারে উপবাসের সময় নির্ধারণ করে থাকে। সাধারণত, ইস্টার পূর্ববর্তী ৪০ দিন, যার মধ্যে খ্রিষ্টানরা অন্তত ১২ ঘণ্টা খাদ্য থেকে বিরত থাকেন। কেউ কেউ আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য উপবাস পালন করেন। এই রীতির মাধ্যমে তারা আত্মশুদ্ধি ও ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগের অভ্যাস গড়ে তোলেন।

সুতরাং, দেখা যায় যে সরাসরি ইসলামের আগের প্রাচীন সভ্যতাগুলোর মধ্যে রোজার ধারা খুবই গভীর প্রতীয়মান। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে রোজার এই প্রথা বিভিন্ন রূপে ও অর্থে বিদ্যমান ছিল। আজকের মুসলমানদের রোজা এক ঐতিহ্যবাহী অনুশীলন, কিন্তু এর আদিরূপ ও প্রাচীন ইতিহাস আলোড়ন সৃষ্টি করে বাঙালি ও বিশ্ববিহারীর মনোযোগ।