পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা থেকে ৯০ লাখ নাম বাদ

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ৪:০২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৭, ২০২৬

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোটার তালিকা সংশোধনকে

কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আগামী ২৩ ও ২৯

এপ্রিল দুই দফায় অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনের আগে ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিশেষ

নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজ্যটির প্রায় ৯০ লাখ মানুষের নাম ভোটার

তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার হারানোর বিষয়টি

রাজ্যের মোট ৭ কোটি ৬০ লাখ ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। নজিরবিহীন এই সংশোধন প্রক্রিয়ায়

নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই

রাজ্যজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে।

ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়াদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় ৬০ লাখ

মানুষকে ‘অনুপস্থিত’ বা ‘মৃত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি ৩০ লাখ ভোটারের নাম

তালিকায় থাকলেও তাঁদের অবস্থান বর্তমানে অনিশ্চিত; কারণ ট্রাইব্যুনালে নিজেদের

নাগরিকত্ব বা পরিচয় প্রমাণ না দেওয়া পর্যন্ত তাঁদের ভোট দেওয়ার কোনো অনুমতি নেই। এই

প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক ও সাধারণ শ্রমজীবী

মানুষ। উদাহরণস্বরূপ, ৭৩ বছর বয়সী নবিজান মণ্ডলের কথা বলা যায়, যিনি গত ৫০ বছর ধরে

নিয়মিত ভোট দিলেও এবার নিজের নাম তালিকায় খুঁজে পাচ্ছেন না। সরকারি নথিপত্রে নামের

সামান্য বানানের অমিল বা ডাকনাম ব্যবহারের মতো সাধারণ করণিক ভুলের কারণে হাজার

হাজার নবিজান এখন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত।

নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপের প্রভাব সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে মুসলিম

অধ্যুষিত জেলাগুলোতে। ২০১১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার

প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়াদের

সংখ্যা এই জেলাগুলোতে তুলনামূলক অনেক বেশি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে মুর্শিদাবাদ

জেলায় ৪ লাখ ৬০ হাজার, উত্তর চব্বিশ পরগনায় ৩ লাখ ৩০ হাজার এবং মালদায় ২ লাখ ৪০

হাজার ভোটারের নাম কাটা পড়েছে। মানবাধিকার কর্মী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি,

এটি কেবল একটি প্রশাসনিক ভুল নয়, বরং সুপরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট একটি ভোটিং ব্লককে

অচল করে দেওয়ার অপচেষ্টা।

ভোটাধিকারের এই সংকটের রেশ পৌঁছেছে ভারতের লোকসভা পর্যন্ত। বিশেষ বর্ধিত বাজেট

অধিবেশনে নারী সংরক্ষণ বিল নিয়ে আলোচনার সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ

এবং সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ সৃষ্টি হয়।

অখিলেশ যাদব প্রশ্ন তোলেন যে, মুসলিম জনগোষ্ঠী কি এই সংরক্ষণের সুবিধা থেকে বঞ্চিত

হবে? এর জবাবে অমিত শাহ অত্যন্ত কটাক্ষের সুরে বলেন যে, সমাজবাদী পার্টি চাইলে

তাঁদের সব টিকিট মুসলিম নারীদের দিতে পারে, এতে কেন্দ্রের কোনো বাধা নেই। লোকসভার

এই উত্তাপ মূলত পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনি হাওয়াকেই প্রতিফলিত করছে।

এদিকে, নির্বাচনি প্রচারণায় সাম্প্রদায়িক ইস্যুগুলো আরও জোরালোভাবে সামনে উঠে আসছে।

গত বুধবার জলপাইগুড়ির এক জনসভায় অমিত শাহ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কড়া

সমালোচনা করে ঘোষণা করেন যে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গে ‘বাবরি মসজিদ’-এর মতো

কোনো কাঠামো তৈরি করতে দেওয়া হবে না। তাঁর এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে তীব্র

প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন আমজনতা উন্নয়ন পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুমায়ুন কবির। তিনি

চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেছেন যে, মসজিদ নির্মাণ কেউ আটকাতে পারবে না এবং আগামী দুই

বছরের মধ্যেই এর কাজ সম্পন্ন হবে। নির্বাচনের আগমুহূর্তে ভোটাধিকার বাতিল এবং এমন

ধর্মীয় মেরুকরণ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে এক চূড়ান্ত উত্তেজনার দিকে ঠেলে

দিয়েছে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এখন কেবল একটিই প্রশ্ন—তাঁদের নাগরিক পরিচয় ও অধিকার

শেষ পর্যন্ত সুরক্ষিত থাকবে কি না।