যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা ব্যর্থ, কোন পথে বিশ্ব Staff Staff Reporter প্রকাশিত: ৪:০৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৩, ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ থামাতে ২১ ঘণ্টার আলোচনার পরও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দীর্ঘ বৈঠক শেষে গতকাল রোববার যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এমনটাই বলেছেন। এদিকে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার কারণে এর প্রভাব পুরো বিশ্বে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। জেডি ভ্যান্স জানান, তেহরানকে ‘চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব’ দেওয়ার পর তিনি আলোচনার টেবিল ছেড়ে যাচ্ছেন। এদিকে ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অযৌক্তিক দাবিকে দায়ী করা হয়েছে। পরস্পরকে দোষারোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালালে তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। এ ঘটনায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শনিবার ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। এটি ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। ভ্যান্স বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ইরানের কাছ থেকে একটি ‘মৌলিক প্রতিশ্রুতি’চাইছে ওয়াশিংটন। তবে এ আলোচনায় তেমন কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানকে প্রস্তাবটি বিবেচনার জন্য কিছুটা সময় দিচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ভ্যান্স। এর আগে গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, আলোচনার সুযোগ দিতে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে দুই সপ্তাহের জন্য হামলা স্থগিত রাখবে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া এই আলোচনায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই কঠোর অবস্থান নেয়। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণকারী জাহাজ পাঠানো হয়েছে বলে ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ইরানি গণমাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ‘অতিরিক্ত দাবি’করছে বলে অভিযোগ করার পরপরই বোঝা গিয়েছিল যে আলোচনায় টানাপড়েন চলছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে আনা-নেওয়া করা হয়। এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অযৌক্তিক’ দাবির কারণে ইসলামাবাদে আলোচনা ভেস্তে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে আইআরআইবি বলেছে, ‘ইরানি প্রতিনিধিদল ইরানি জনগণের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য টানা ২১ ঘণ্টা নিবিড়ভাবে আলোচনা চালিয়ে গেছে। ইরানি পক্ষের বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের অযৌক্তিক দাবিগুলো আলোচনার অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এভাবে আলোচনা থেমে গেছে।’ আলোচনা ভেস্তে গেল কেন? একদিনব্যাপী ম্যারাথন বৈঠকের পরও দুই পক্ষের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, এই ব্যর্থতা হঠাৎ করে নয় বরং দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, কৌশলগত দ্বন্দ্ব এবং জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। দ্য গার্ডিয়ান ও আল জাজিরা বলছে, আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ইরান যেন পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন না করে এবং এ বিষয়ে স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমকে ‘অধিকার’ হিসেবে তুলে ধরে এবং তা সীমিত করতে অনীহা দেখায়। এই ইস্যুতেই আলোচনায় সবচেয়ে বড় অচলাবস্থা তৈরি হয়। একইসঙ্গে অর্থনৈতিক প্রশ্নও আলোচনাকে জটিল করে তোলে। ইরান চেয়েছিল বিদেশে জব্দ থাকা তাদের বিপুল সম্পদ মুক্ত করা হোক এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এসব বিষয়ে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার কথা বললেও তাৎক্ষণিক ছাড় দিতে রাজি হয়নি। ফলে দুই পক্ষের অবস্থান আরও দূরে সরে যায় বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও রয়টার্স। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হিসেবে পরিচিত এই প্রণালিতে ইরান তার প্রভাব বজায় রাখতে চায়, আর যুক্তরাষ্ট্র চায় আন্তর্জাতিক নৌচলাচল অবাধ থাকুক। এই দ্বন্দ্ব কেবল দ্বিপক্ষীয় নয় বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত, ফলে সমঝোতা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। দুই পক্ষের পারস্পরিক অভিযোগও আলোচনাকে ব্যাহত করে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান ‘মূল প্রতিশ্রুতি’ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিপরীতে ইরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ‘অতিরিক্ত ও অবাস্তব শর্ত’ চাপিয়ে দিয়েছে। এই দোষারোপের রাজনীতি আলোচনার পরিবেশকে আরও নেতিবাচক করে তোলে বলে উল্লেখ করেছে অ্যাক্সিওস ও আল জাজিরা। আবার তাহলে কী ভয়াবহ যুদ্ধ? যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান উভয় পক্ষই পাকিস্তানে শান্তি আলোচনায় অংশ নিয়েছিল যুদ্ধে তারা জয়ী হয়েছে- এমন দাবি নিয়ে। তাই এত অল্প সময়ে কোনো একটি চুক্তিতে পৌঁছানো দেশ দুইটির পক্ষে স্বাভাবিক বিচারেই কঠিন ছিল। ইতোমধ্যে ব্যর্থতার জন্য উভয় পক্ষই পরস্পরকে দায়ী করে ফিরে গেছে। গত বুধবার দেশ দুইটির মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, তা শুরু হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘অ্যাপোক্যালিপটিক’ বা ধ্বংসাত্মক হুমকির মধ্য দিয়ে, যেখানে তিনি ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এখন তাহলে কী হবে? যুদ্ধবিরতি কি বহাল থাকবে? বিবিসি সংবাদদাতা জো ইনউড বলেন, ইরানের ওপর নতুন করে হামলা শুরু হবে কিনা, তা নিয়ে কোনো ঘোষণা আসেনি, তবে হামলার সম্ভাবনা যে নিশ্চিতভাবেই বেড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হরমুজ প্রণালি, যে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ যা ইরান আংশিকভাবে কিন্তু কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল, তা আলোচনার মাধ্যমে পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি আপাতত আলোচনার টেবিলের বাইরে রয়ে গেছে। কিন্তু, পারস্য উপসাগরে কয়েকদিন আগে মোতায়েন করা দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো অন্য কোনো পথের কথা ভাবছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না- এমন বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি দিতে ব্যর্থ হওয়াটাই ছিল আলোচনা সফল হওয়ার পথে প্রধান বাধা। ইরান সবসময়ই দাবি করে এসেছে যে তারা মারণাস্ত্র উৎপাদন করতে চায় না, কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে দুটি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হওয়ায় তাদের দেশে পারমাণবিক অস্ত্রের সমর্থকদের এখন পারমাণবিক শক্তি অর্জনে আরও উৎসাহিত করবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এ সরাসরি আলোচনা ছিল ঐতিহাসিক, কিন্তু এটি হয়তো কূটনীতির একটি ব্যর্থতা হিসেবেই ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। SHARES আন্তর্জাতিক বিষয়: