জ্বালানি সংকটের অজুহাত, অতিরিক্ত দামে বিক্রি Staff Staff Reporter প্রকাশিত: ৪:০২ অপরাহ্ণ, মার্চ ৮, ২০২৬ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে হঠাৎ করেই সংকট সৃস্টি করে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ব্যবসায়িদের বিরুদ্ধে। এজন্য অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত তেল কিনে মজুদ করে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। এই অবস্থা চলছে দেশজুড়েই। এতে বিপাকে পড়েছেন বিভিন্ন যানবাহরেন চালক, কৃষক, শ্রমিক, ইঞ্জিনচালিত নৌকা মালিক ও সাধারণ ভোক্তারা। কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, নগরীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও পেট্রোল ও অকটেনের সংকট দেখা দিয়েছে। তেল নিতে এসে অনেক গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালককে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। কেউ কেউ তেল না পেয়ে ফিরে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন। নগরীর চকবাজার এলাকার নুরুল হুদা পাম্পের ম্যানেজার ইকবাল হোসেন বলেন, সরকারি নীতি অনেক চালকই মানছেন না। মোটরসাইকেলে ২ লিটার পর্যন্ত তেল দেওয়ার কথা থাকলেও অনেকে তার চেয়ে বেশি নিতে চান। তারা একবার তেল নিয়ে আবার ঘুরে এসে লাইনে দাঁড়ান। এভাবে চলতে পারে না। অন্যদিকে চালকদের অভিযোগ, নির্ধারিত সীমা মেনে তেল বিক্রি না করে অনেক পাম্পে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এতে সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তি বাড়ছে। বাহনচালক আবদুল আওয়াল বলেন, পর্যাপ্ত থাকলেও পাম্প মালিক ও অসাধু সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। তবে পাম্প মালিকরা দাবি করছেন, হঠাৎ করে বেশি পরিমাণ তেল নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, সীমান্তে বিজিবির কড়া নজরদারির ফলে তেল পাচার বন্ধ রাখা সম্ভব হবে। হরিরামপুর(মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, হরিরামপুর একটি কৃষিপ্রধান উপজেলা। এখানকার অধিকাংশ কৃষক সেচের কাজে ডিজেল নির্ভর সেচযন্ত্র ব্যবহার করেন। আর চরাঞ্চলে পারাপারের জন্য ইঞ্জিন চালিত নৌকা ব্যবহার করে থাকে, ফলে হঠাৎ তেলের সংকট দেখা দেওয়ায় কৃষিকাজ আর পদ্মানদী পারাপার নিয়ে অতিরিক্ত খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। তবে হরিরামপুরের বিভিন্ন বাজারে সরেজমিনে দেখা গেছে, অতিরিক্ত দাম দিলেই মিলছে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, সিলিন্ডার গ্যাস। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন পাইকারী ব্যবসায়ীরা সংকটের দোহাই আর দাম বেশি নেওয়ায় দাম বৃদ্ধি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে গত কয়েকদিনে পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারা মিলে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। উপজেলার ঝিটকা,চালা, দিয়াবাড়ি, লেছরাগঞ্জ, আন্ধারমানিক, হরিরামপুর উপজেলা, কান্ঠাপাড়া, বলড়াসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই ভোক্তারা তেলের খোঁজে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরছেন। অনেককে খালি গ্যালন হাতে ঘুরতে দেখা গেছে। রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের রাকিব জানান, ঝিটকা বাজারে জয়নাল আর মতির দোকানে মজুদ থাকা সত্ত্বেও তেল দিচ্ছে না। আবার গোপনে অতিরিক্ত দাম দিলেই মিলছে তেল। ঝিটকা নাজারের মেসার্স ওয়াজিহা ট্রেডার্সের দোকানে তেল নিতে এসে ফিরে যান মোটরসাইকেল চালক সামসুল হক মিলন। তিনি বলেন, গাড়িতে তেল নেই। তেল নিতে এসে দেখি দোকান বন্ধ। এখন কীভাবে চলবো বুঝতে পারছি না। বাল্লা ইউনিয়নের ভাদিয়াখোলা গ্রামের কৃষক কাশেদ আলী বলেন, ডিজেল নিতে এসেছিলাম। দোকান বন্ধ থাকায় ফিরে যেতে হচ্ছে। ডিজেল ছাড়া সেচ দিতে পারবো না। পানি দিতে না পারলে ধানের চারা নষ্ট হয়ে যাবে। ঝিটকা এলাকার মেসার্স ওয়াজিহা ট্রেডার্সের মালিক মো. সুজন মিয়া বলেন, আমার দোকানে আধা লিটার তেলও নেই। তেলের গাড়ি আসার কথা ছিল, কিন্তু আসেনি। এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান রুমেল বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তেল মজুত করলে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতিরিক্ত তেল মজুত, মেহেরপুরের বেশিরভাগ তেল পাম্প বন্ধ: মেহেরপুর প্রতিনিধি জানান, জ্বালানি তেলের সংকট হবে এমন আশংকায় অতিরিক্ত তেল মজুদের চেষ্টা করছেন সাধারণ ক্রেতারা। ফলে আমদানির তুলনায় তেলের চাহিদার বেশি হওয়াতে হিমশিম খাচ্ছে পাম্পগুলো। যে কারণে অধিকাংশ তেল পাম্প বন্ধ করে রেখেছেন মালিকরা। ফলে যেখানে পাম্প খোলার খবর পাওয়া যাচ্ছে সেখানেই ছুটছে ক্রেতারা। এ অবস্থা চলতে থাকলে এবার বোরো চাষ বিঘ্ন হবে বলে আশঙ্কা করছেন চাষিরা। গাংনী উপজেলার নিশিপুর গ্রামের কৃষক ফয়সাল উদ্দিন জানান, তিনি ১০ বিঘা জমিতে বোরো ধান রোপণ করেছেন। তার শ্যালো মেশিনের অধীনে আড়াইশ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া হয়। ৩-৪ দিন ধরে পাম্পগুলো ঘুরে অল্প অল্প করে ডিজেল পেলেও দুদিন ধরে ডিজেল কিনতে পারেননি। ফলে জমিতে সেচ দেওয়া অনিশ্চিত হয়ে গেছে। আরেক চাষি কাওছার আলী বলেন, তেল পাম্পে তেল কিনতে গেলে এক ঘন্টা লাইন দিয়ে দাড়িয়ে থাকা লাগছে। এক ঘন্টা যদি তেল নিতে গিয়েই ফুরিয়ে যায়। তাহলে অন্য কাজ করবো কখন। ট্রাকচালক আমিরুল ইসলাম বলেন, আমি সিলেট যাবো। সেজন্য রাতে বামন্দী তেল পাম্পে তেল নিতে গিয়েছিলাম। আমাকে তেল পাম্প মালিক ৩০ লিটারের বেশি তেল দেবেন না। অথচ পুরো পথ যেতে তিনশ লিটার তেলের প্রয়োজন হবে। এভাবে চলতে থাকলে দুরপাল্লার গাড়ি সব বন্ধ হয়ে যাবে। আরেক ট্রাক চালক শাহারুল ইসলাম বলেন, আমাদের মেহেরপুর থেকে সবজি লোড হয়ে ঢাকা কাওরান বাজারে যায়। কয়েকদিন ঠিকভাবে তেল পাচ্ছি না। ফলে ঢাকার ট্রিপ বাতিল করতে হচ্ছে। এতে এলাকার সবজি চাষিরা লোকশানে পড়বে। ঢাকায় সবজি না পৌছলেও দাম বেড়ে দিগুন হয়ে যাবে। জেলা তেল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি নুর হোসেন আঙ্গুর বলেন, তেলের দাম বাড়ার কোনো খবর আমাদের কাছে নেই। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের খবরে মানুষ আতঙ্কে পাম্পে ভিড় করছে। আমরা মজুত অনুযায়ী নির্ধারিত মূলেই তেল বিক্রি করছি। তবে কোনো কোনো পাম্পের মজুত শেষ হয়ে গেলে ক্রেতারা তা মানতে না চাওয়ায় বাধ্য হয়ে পাম্প বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে। জেলা তেল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি নুর হোসেন আঙ্গুর বলেন, তেলের দাম বাড়ার কোনো খবর আমাদের কাছে নেই। আমরা মজুত অনুযায়ী নির্ধারিত মূলেই তেল বিক্রি করছি। তবে তেলের মজুত শেষ হয়ে গেলে পাম্প বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে। মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক ড. সৈয়দ এনামুল কবির বলেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করার চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনেকেই আতঙ্কে তেল কিনছে। তবে বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। পাম্প মালিকরা প্রাপ্যতা অনুযায়ী তেল বিক্রি করছেন। জেলা প্রশাসন থেকে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা) প্রতিনিধি জানান, জীবননগর ফিলিং স্টেশন, পেয়ারাতলায় মেসার্স উৎসব ফিলিং স্টেশন, সন্তোষপুরে মেসার্স অংগন ফিলিং স্টেশন ও দেহাটিতে মেসার্স পিয়াস ফিলিং স্টেশনে ঘুরে জ্বালানি তেল কেনার জন্য যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল আরোহীরা তেল কেনার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকেই আবার বড় কন্টিনার ও প্লাস্টিকের পাত্রে করে তেল নিয়ে যাচ্ছে। এদিকে খুচরা বাজারে তেল বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু মাত্র পেট্রোলপাম্প গুলোতে তেল পাওয়া যাচ্ছে। মেসার্স অংগন ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার ফরহাদ হোসেন জানান, গত কয়েকদিন ধরে তেল বিক্রি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। গাড়ির ট্যাঙ্কি খালি না হলেও সবাই ট্যাঙ্কি ফুল করে তেল নিয়ে যাচ্ছে। গাড়ির ট্যাঙ্কিতে ছাড়াও অনেকেই বিভিন্ন পাত্রে তেল নিচ্ছে। তেল বিক্রি নিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন যে নির্দেশনা দিয়েছে সেই নিয়ম মেনেই তেল বিক্রি করা হবে। তেল নিতে আসা মোটরসাইকেল চালক ওয়ালিউল্লাহ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। অনেকেই বলছেন তেলের সংকট দেখা দেবে। সামনে ঈদ। ঈদের সময় ঘোরাঘুরির জন্য দেড় হাজার টাকার পেট্রোল কিনে রেখে দিলাম। পাম্পে তেল কিনতে আসা মোবারক হোসেন বলেন, দেড় বিঘা জমিতে ইরি ধান চাষ করেছি। এখন নিয়মিত জমিতে সেচ দেওয়া লাগছে। শুনছি বিদেশে যুদ্ধ লেগে গেছে যার কারনে বেশি করে ডিজেল তেল কিনে রেখে দিচ্ছি। SHARES সারা বাংলা বিষয়: