ঋণের সুদ ও ব্যাংকিং খাতের ক্ষত: নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জের ছড়াছড়ি

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ৮:৩৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬

দেশের অর্থনীতিতে এক ক্রান্তিকালীন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নতুন সরকার শপথ নেওয়ার মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তবে অর্থনীতির এই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলায় বেশ কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আজ মঙ্গলবার, বিএনপি নেতৃত্বাধীন অস্থায়ী সরকারের ঊর্ধ্বতন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেওয়ার আগে তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি নোট জমা দিয়েছেন, যা তিনি ‘বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঝুঁকি এবং নীতি-অগ্রাধিকার’ শিরোনামে সাজিয়েছেন। এই নোটে তিনি দেশের অর্থনীতির ভয়াবহ চিত্র ও ভবিষ্যৎ পথনকশা তুলে ধরেছেন, যা নতুন সরকারের জন্য এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বিগ্নতা সৃষ্টি করেছে ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ, যা অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

তিনি স্পষ্ট করেছেন, বর্তমান অর্থনীতির মূল সমস্যা হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গিয়ে প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়ে পড়া। পাশাপাশি, কম রাজস্ব সংগ্রহ, দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও বাজেট ঘাটতি দেশের শক্তি ক্ষয় করছে। সরকারের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় দেশি ও বিদেশি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, আর তার বিপরীতে বড় অঙ্কের সুদ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য শুধু নজরদারি ও সংস্কার কর্মসূচিগুলো জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন ড. সালেহউদ্দিন। তিনি বলেছেন, নতুন কোনো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণের পরিবর্তে চলমান সংস্কার কাজগুলো শক্তিশালীভাবে চালিয়ে যাওয়া ইতিবাচক হবে।

বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের অবস্থা বেশ উদ্বেগজনক। সিপিডির গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১৫ বছরে ব্যাংক থেকে প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকা লুটপাট হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে ব্যাংক ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশই খেলাপি, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভীতকে দুর্বল করে দিচ্ছে। নতুন সরকার এই খাতে শক্তিশালী আইন ও নিয়ম চালু করে অর্থনীতির ভিত্তি সুদৃঢ় করতে হবে, বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া, সেপ্টেম্বরের পরে বাজারভিত্তিক সুদহারের কার্যক্রম চালু হলেও খেলাপি ঋণ ও পুঁজি সংকটের কারণে ঋণ প্রবাহ কমে গেছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোকে একীভুত করে কিছু ব্যাংককে চালু করতে হচ্ছে এবং অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগের প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হচ্ছে, এতে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য অনেক উদ্যোগ গ্রহণের পরও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এখনো সম্ভব হয়নি। ফলে, তাঁদের মূল আয়ের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। তবে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও কৃচ্ছ্রসাধনের ফলে আগামী জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নীচে নামতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজস্ব ও মুদ্রানীতির ওপর জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি, রপ্তানি বাড়ানোর মাধ্যমে বৈদেশিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্ব দিয়েছেন, কারণ বর্তমানে আমদানির তুলনায় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে কম।

নতুন অর্থমন্ত্রী যখন দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, তখন তাঁকে এই উত্তরাধিকার নোটটি আনুষ্ঠানিকভাবে অর্থ বিভাগের সচিব তুলে দেন। এতে ভ্যাট অটোমেশন, ই-ইনভয়েস দ্রুত চালু, এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অভ্যন্তরীণ সংস্কার রূপায়ণের ওপর জোর দেওয়া হয়। মূল লক্ষ্য হলো, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও অর্থনীতির দুর্বলতাকে শক্তিশালী করে তোলা। তবে এই প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করতে হলে নতুন সরকার কতটা দক্ষতার সঙ্গে এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মূলত, ঋণের বোঝা কমানো ও ব্যাংকিং খাতের ক্ষত পেরিয়ে অর্থনীতিকে আবার সচল করা হবে এখনকার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।