প্রভিডেন্ট ফান্ডের শত কোটি টাকা বকেয়া, অনিশ্চিত ভবিষ্যত চা শ্রমিকদের

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ২:৩৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৭, ২০২৬

দেশের চা শিল্পের প্রাণভোমরা চা শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তার প্রধান অবলম্বন হিসেবে আখ্যাপ্রাপ্ত প্রভিডেন্ট ফান্ড (পিএফ) বর্তমানে ভয়ংকর সংকটের মুখে পড়েছে। দেশের ১৬৭টি চা-বাগানের মধ্যে বিশাল সংখ্যক—অর্থাৎ ৫৮টি বাগানে শ্রমিকদের সঞ্চিত এই তহবলের অনেক টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে। এর ফলে অবসরের সময় বা জরুরি অবস্থায় শ্রমিকরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ পেতে গিয়ে গভীর দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছেন, দিন গুনছেন মহা অনিশ্চয়তায়।

নিয়ম অনুযায়ী, মাহে প্রতি চা শ্রমিকের মূল বেতনের ৭.৫% অর্থ প্রভিডেন্ট ফান্ডে কেটে নেওয়া হয়। এই অর্থের সঙ্গে আরও ৭.৫% সরাসরি যোগ করে মোট ১৫% টাকা জমা দেওয়ার কথা থাকে। সেই সঙ্গে, প্রশাসনিক খরচ হিসেবে এই টাকার উপর আরও ১৫% বাগান কর্তৃপক্ষকে দিতে হয়। তবে অভিযোগ উঠেছে, শ্রমিকের অংশ ঠিকই কেটে নেওয়া হলেও মালিকপক্ষ সময়মতো সেই টাকা তহবিলে জমা দিচ্ছেন না।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছিলেন, শ্রমিকের টাকা কেটে নিয়ে বাগান কর্তৃপক্ষ তা দিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে। পাশাপাশি, সময়মতো টাকা জমা না হওয়ার কারণে শ্রমিকদের জন্য সুদের অংকও কমে আসছে, যা তাদের জন্য খুবই উদ্বেগের বিষয়।

বেলজিয়াম ভবিষ্যত তহবিল নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ২৮ ফেব্রুয়ারি হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৫৮টি চা বাগানে পিএফ-এর বিপুল পরিমাণ টাকা বকেয়া রয়েছে। এই বকেয়ার মেয়াদ বাগানভেদে তিন মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত। শ্রমিক নেতারা বলছেন, এই বকেয়া অর্থের পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে সাম্প্রতিক তৎপরতায় প্রায় ১০ কোটি টাকা আদায় সম্ভব হয়েছে।

আলীনগর চা-বাগানের শ্রমিক সত্য নারায়ণ জানাচ্ছিলেন, নিয়ম অনুযায়ী অবসরের তিন মাসের মধ্যে তার টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও তাকে এক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। অন্যদিকে, চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি পঙ্কজ কুন্দ বলছেন, স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের জন্য এই সঞ্চয়টাই শেষ ভরসা, সেটি যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে বড় ধরনের জীবন সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাগান মালিকের পক্ষ থেকে সাতগাঁও চা-বাগানের ব্যবস্থাপক সিদ্দিকুর রহমান বলছিলেন, দীর্ঘদিনের লোকসান ও উৎপাদন খরচের তুলনায় চায়ের মূল্য কম থাকার কারণেই এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, দ্রুত বকেয়া পরিশোধের জন্য সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের উপপরিচালক মহব্বত হোসাইন বলছেন, বকেয়া আদায়ের জন্য প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তিনি জানাচ্ছেন, ইতিমধ্যে ৬টি বাগানের বিরুদ্ধে শ্রম আইনে মামলা দাওয়া হয়েছে এবং ৫৮টি বাগানকে বকেয়া পরিশোধের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে। ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিয়মিত তদারকি ও পরিদর্শন চালিয়ে যাচ্ছে।

শ্রম অধিদপ্তরের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত একটি ট্রাস্টি বোর্ড এই তহবিলের দেখভাল করছে। শ্রমিকরা দাবি করেছেন, তদারকি আরও জোরদার করে মাসিক অর্থের সঠিক সময়ে জমা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাদের শেষ বয়সের মজুরি নিরাপদে থাকায়।