হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ ইরানের নিয়ন্ত্রণে

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ১:০৫ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৩, ২০২৬

হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ ইরানের নিয়ন্ত্রণে এবং এখান দিয়ে চলাচলের জন্য ইরানি মুদ্রা

রিয়ালে টোল পরিশোধ করতে হবে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ

‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হাজি বাবেয়ি এ কথা

জানিয়েছেন। মেহের নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, হাজি বাবেয়ি হরমুজ

প্রণালিকে তেহরানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

পাকিস্তানে ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট

জেডি ভ্যান্স এক সংবাদ সম্মেলন করেন। তবে সেখানে তিনি হরমুজ প্রণালির বিষয়ে কোনো

মন্তব্য করেননি। অথচ এই জলপথটি আলোচনার অন্যতম প্রধান অমীমাংসিত বিষয় ছিল। বর্তমানে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতি চলছে, তার একটি অন্যতম শর্ত

হলো এই প্রণালি দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।

বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই

হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই জলপথের ওপর যেকোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা বাধা

বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের কারণ হতে পারে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ

সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি ‘শীঘ্রই উন্মুক্ত’ হবে।

অন্যদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে যে তাদের দুটি যুদ্ধজাহাজ মাইন

অপসারণ অভিযানের অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তবে ইরান এই দাবি সরাসরি

প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম

আইআরআইবি-এর মাধ্যমে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেকোনো সামরিক

জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করা হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মার্কিন নৌবাহিনীর ২টি জাহাজের হরমুজ অতিক্রমের দাবি নাকচ করল ইরান

মধ্যপ্রাচ্যের দায়িত্বে থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)

বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর দুটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তবে এ

দাবি নাকচ করেছে ইরান।

সেন্টকমের পক্ষ থেকে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ডেস্ট্রয়ার—ইউএসএস ফ্রাঙ্ক ই

পিটারসন ও ইউএসএস মাইকেল মারফি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে আরব উপসাগরে কার্যক্রম

পরিচালনা করেছে।

সেন্টকমের ভাষ্য, এটি তাদের একটি বৃহত্তর মিশনের অংশ। এর উদ্দেশ্য হলো ইরানের

ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালিতে যে মাইন স্থাপন করেছিল, তা

সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে কি না, সেটি নিশ্চিত করা।

এক বিবৃতিতে মার্কিন নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার হরমুজ প্রণালিতে

যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজগুলোর উপস্থিতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, ‘আজ আমরা একটি নতুন পথ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু

করেছি এবং বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ উৎসাহিত করতে শিগগির এই নিরাপদ নৌপথ নৌপরিবহন

খাতের সঙ্গে ভাগ করে নেব।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর

পরিপ্রেক্ষিতে ইরান এই সংকীর্ণ প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বাণিজ্যিক ও

সামরিক—উভয় ধরনের জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম

দ্রুত বেড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের দুটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার বিষয়ে মার্কিন দাবি

প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতির পরপরই ইরানের সামরিক বাহিনীর

খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের একজন মুখপাত্র মার্কিন দাবি নাকচ করেন।

এই মুখপাত্র বলেন, হরমুজ প্রণালির দিকে মার্কিন জাহাজগুলোর অগ্রসর হওয়া ও প্রবেশের

বিষয়ে সেন্টকম কমান্ডারের দাবি নাকচ করা হলো। এই পথ দিয়ে যেকোনো জাহাজ চলাচলের

অনুমতি ইরানের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কোনো সামরিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি

অতিক্রমের চেষ্টা করলে আইআরজিসি ‘কঠোর জবাব’ দেবে বলে হুঁশিয়ার করেন ইরানের এই

সামরিক কর্মকর্তা।

হরমুজ প্রণালি থেকে বিপুল আয় ইরানের

গত এক মাসে অন্তত ১০০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছে লয়েডস

লিস্ট ইন্টেলিজেন্স। শনিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক

প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।

জানা গেছে, এই টোলের পরিমাণ একটি জাহাজের জন্যই ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত

ঠেকছে। প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্রোকার ও জাহাজ মালিকদের বরাত দিয়ে জানানো

হয়েছে, ইরানি নয় এমন জাহাজগুলোকে ওই পথ দিয়ে চলাচলের জন্য ইরান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে

টোল নিয়ে দরকষাকষি করতে হচ্ছে।

হরমুজ নিয়ে ১৮০ ডিগ্রি উল্টে গেলেন ট্রাম্প

হরমুজ প্রণালি ইসলামাবাদ আলোচনার সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি। কিন্তু এই প্রণালি

নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আসল অবস্থান কী, সেটাই এখন পরিষ্কার নয়। ওয়াশিংটন থেকে

সাংবাদিক মাইক হান্না এই মন্তব্য করেছেন।

মাত্র দশ দিনের মধ্যে ট্রাম্প এই প্রণালি নিয়ে পুরোপুরি বিপরীত দুটি কথা বলেছেন।

একবার তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কাজে আসে না। সেখান দিয়ে যে

তেল যায় তা ওয়াশিংটনের দরকার নেই। অন্য দেশগুলোই এই প্রণালি পাহারা দিক এবং

ইরানের সাথে সমস্যা মেটাক।

কিন্তু কিছুদিন পরেই তিনি ১৮০ ডিগ্রি উল্টে গেলেন। তিনি বললেন, হরমুজ প্রণালি খোলা

রাখাটাই মার্কিন দাবির কেন্দ্রে আছে। প্রণালি না খুললে কোনো আলোচনাই হবে না। এই

দুটি অবস্থান একসাথে মেলানো সম্ভব নয়। তাই ট্রাম্প আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন,

সেটা বোঝা যাচ্ছে না।

একটি বিষয় অবশ্য পরিষ্কার। ইরান মনে করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণই তাদের সবচেয়ে

বড় শক্তি। সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় না করে তারা এই কার্ড ছাড়বে না। আর

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান যখন প্রশ্নভেদে ও সময়ভেদে বদলে যায়, তখন পরের দফা

আলোচনায় এই বিষয়ে কোনো সমাধান হবে কিনা সেটা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।