সংঘাত বন্ধে ঐতিহাসিক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান Staff Staff Reporter প্রকাশিত: ১:০৪ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১২, ২০২৬ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বৈঠক চলছিল। ইসলামাবাদের এ আলোচনা নিয়ে নানা শঙ্কা থাকলেও নির্ধারিত সময়েই দুই দেশ বৈঠকে বসেছে। পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিদেশীয় আলোচনা হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরু হয়। গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। এরপর তাদের মধ্যে আলোচনার চেষ্টা শুরু করে পাকিস্তান। তারই ফলশ্রুতিতে বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠকটি শুরু হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এ আলোচনাকে ‘দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথে প্রথম ধাপ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। শনিবার (১১ এপ্রিল) ইসলামাবাদে পৌঁছে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়, এই আলোচনায় দুই পক্ষের গঠনমূলক অংশগ্রহণকে স্বাগত জানিয়ে শাহবাজ শরিফ আশা প্রকাশ করেন- এ সংলাপ আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইলকফ এবং সাবেক উপদেষ্টা জারেড কুশনার। অন্যদিকে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন রেজা নকভি উপস্থিত ছিলেন। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে যা জানা গেল: ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুরুতে বলা হচ্ছিল, দুই দেশের প্রতিনিধিরা পরোক্ষভাবে আলোচনায় অংশ নেবেন। তবে পরে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সরাসরি আলোচনা শুরু হয়। এটাকে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেকগুলি বিষয় আলোচনায় এসেছে। সূত্রের বরাত দিয়ে আল–জাজিরা বলছে, লেবাননে যা ঘটছে তার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। কিছু সূত্র ইঙ্গিত দেয়, [ইসরায়েলের] অভিযান এখন লেবাননের দক্ষিণে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং বৈরুতে আর কোনও হামলা হবে না। ইরানের সূত্র অনুযায়ী, দেশটির সম্পদ ছাড় হতে যাচ্ছে, এমন কিছু পরিবর্তনও হয়েছে। যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে আলোচনা এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের দুই সপ্তাহের বিরতির মধ্যে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের উপস্থিতি গতকাল শনিবার সকালে ইসলামাবাদে পৌঁছান মার্কিন প্রতিনিধি দল। নূর খান এয়ারবেসে তাদের স্বাগত জানান ইসহাক দার, মহসিন রেজা এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনির। অন্যদিকে ইরানি প্রতিনিধি দলও আলোচনায় অংশ নিতে ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ১৯৭৯-এর পর প্রথম উচ্চপর্যায়ের সরাসরি সংলাপ বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালের পর এই প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এমন উচ্চপর্যায়ের সরাসরি আলোচনা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। জটিল এজেন্ডা, বড় চ্যালেঞ্জ আলোচনার পথ মোটেও সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে ইরান দাবি করছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচলের অধিকার এবং বিদেশে জব্দ থাকা সম্পদ মুক্ত করা। এছাড়া লেবাননে হামলা বন্ধ, আঞ্চলিক মিত্রদের ভূমিকা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি—এসব বিষয়েও মতপার্থক্য রয়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক পদক্ষেপ আবারও শুরু হতে পারে। অন্যদিকে পাকিস্তান বলছে, তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে আলোচনাকে সফল করতে। সতর্ক আশাবাদ কূটনৈতিক মহলের ধারণা, দুই দিনের এই প্রাথমিক বৈঠক থেকে বড় কোনো চুক্তি নাও আসতে পারে। তবে এটি ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ তৈরি করতে পারে এবং উত্তেজনা কমানোর একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে, ইসলামাবাদে শুরু হওয়া এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদিও এর সাফল্য এখনো অনিশ্চিত। মুখোমুখি বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে চলমান আলোচনায় বড় পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছে আল-জাজিরা। এর আগে আলোচনা পরোক্ষভাবে চলছিল। সে সময় দুই পক্ষ আলাদা কক্ষে অবস্থান করছিল এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা বার্তা আদান-প্রদান করছিলেন। তবে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় বিষয়টিতে নতুন মোড় নেয়। মধ্যস্থতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাতে আল-জাজিরা জানায়, এবার দুই দেশের প্রতিনিধিরা সরাসরি আলোচনায় বসেছেন। আলোচনার টেবিলে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরাও উপস্থিত রয়েছেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এটাই প্রথমবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি বৈঠকে বসেছেন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন পিটিভি নিউজও জানিয়েছে, ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শুরু হয়েছে। তারা এটিকে ‘ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। পিটিভি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথমবারের মতো দুই দেশের প্রতিনিধিরা একই টেবিলে বসে সরাসরি আলোচনা করছেন। উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের উপস্থিতি, পাকিস্তানের সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা এবং বৈশ্বিক নেতাদের ইতিবাচক বার্তা—সব মিলিয়ে যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আশা আরও জোরাল হয়েছে বলে দাবি করা হয়। যে বিষয়গুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় এখনো বেশ কিছু অমীমাংসিত এবং জটিল বিষয় বা ‘স্টিকিং পয়েন্ট’ রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন আল জাজিরার কূটনৈতিক সম্পাদক জেমস বেস। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই পক্ষই যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে একমত হলেও বেশ কিছু মৌলিক ইস্যুতে এখনো মতবিরোধ কাটেনি। আলোচনার মূল বাধাগুলো: ১. নিরাপত্তা গ্যারান্টি: ইরান তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি চায়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে কঠোর শর্তারোপ করছে। ২. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, অর্থনৈতিক অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা তোলার বিষয়ে ‘ধীরে চলো’ নীতি অবলম্বন করছে। ৩. আঞ্চলিক স্বার্থ: ইরাক, সিরিয়া এবং ইয়েমেনে দেশ দুটির বিপরীতমুখী অবস্থান আলোচনার টেবিলে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উভয় পক্ষই নিজ নিজ প্রভাববলয় বজায় রাখতে মরিয়া। আল জাজিরার জেমস বেস বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, যদিও দুই দেশ টেবিলে বসেছে, যা একটি বড় অগ্রগতি; কিন্তু কয়েক দশকের অবিশ্বাস রাতারাতি দূর হওয়া কঠিন। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দুই দেশের সরকারই প্রবল চাপের মুখে রয়েছে, যা সমঝোতার পথকে পিচ্ছিল করে তুলছে। SHARES আন্তর্জাতিক বিষয়: