প্রতিবেদন: আট মাস ধরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধস, মার্চে বড় ক্ষতি

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ২:৩৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৫, ২০২৬

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে দীর্ঘ সময় ধরে বিরাজ করছে গভীর মন্দা। গত মার্চ মাসে দেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশের বেশি কমে গেছে, যা চলতি অর্থবছরের ৯ মাসের মধ্যে এক মাসে রেকর্ড সর্বোচ্চ পতন। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এটি হলো দেশের অর্থনীতিতে এক নজিরবিহীন ঘটনা, যা গত আট মাস ধরে চলমান নেতিবাচক ধারাকে নির্দেশ করে। এই সময়ে দেশের রপ্তানি আয় সংকুচিত হয়ে পড়েছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইপিবির প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্চ মাসে বাংলাদেশ বিশ্বের বাজারে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে মাত্র ৩৪৮ কোটি ডলার। যা গত বছরের একই মাসে ছিল ৪২৫ কোটি ডলার, অর্থাৎ এক মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ৭৭ কোটি ডলার বা প্রায় ৯ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। সাধারণত মাসে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি পণ্য রপ্তানি হলেও এই মার্চ মাসে তা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে পুরো অর্থবছরের ৯ মাসের রপ্তানি আয়ও কমে গেছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ পতন এসেছে।

রপ্তানি আয় কমার এই অপ্রত্যাশিত ধসের পেছনে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক কারণগুলো মূল হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। অন্যতম বড় কারণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর আরোপিত ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক। গত বছর আগস্ট থেকে কার্যকর এই শুল্কের কারণে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা এবং প্রতিযোগিতার ক্ষমতা অনেক কমে গেছে। পাশাপাশি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো কম দামে পণ্য সরবরাহ করে বাজার দখলে নিয়েছে, যার ফলে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। আবার, মার্চ মাসে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কারখানাগুলো গড়ে ১০ দিন বন্ধ থাকায় উৎপাদনের কর্মবিরতিও রপ্তানি কমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

প্রধান দিক হিসেবে, দেশের অন্যতম বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের অবস্থা কারণ বেশি সংকটের মুখে পড়েছে। গত মার্চ মাসে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। যেখানে গত বছরের মার্চে এটি ছিল ৩৪৫ কোটি ডলার, সেখানে এবার তা কমে এসে ২৭৮ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিজিএমইএ এর পরিচালক এবিএম শামসুদ্দিন বলেন, মার্কিন শুল্কের বেড়ে যাওয়া ও প্রতিযোগীতামূলক দেশগুলোর চাপের সাথে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের মতো জটিলতা মধ্যবর্তী সময়ের জন্য আরও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। এর পাশাপাশি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও লজিস্টিক জটিলতা দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

শুধু পোশাক শিল্প নয়, অন্যান্য বড় রপ্তানি পণ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ইপিবির তথ্য বলছে, গত ৯ মাসে হোম টেক্সটাইলের রপ্তানি কমেছে ২১ শতাংশ, ওষুধের রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে ২০ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ৭ শতাংশ, পাট ও পাটপণ্য ১৩ শতাংশ। সবজি রপ্তানি সবচেয়ে বেশি পতনের শিকার, যা প্রায় ৪৫ শতাংশ কমে গেছে।

তবে, সব নেতিবাচকতার মাঝেও কিছু খাতে ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, হিমায়িত মাছের রপ্তানি ৫ শতাংশ উন্নতি দেখিয়েছে, এবং কাঁকড়া রপ্তানি ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। এই অল্প কিছু ইতিবাচক সূচক রপ্তানি খাতে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বাজার বহুমুখীকরণ ছাড়া এই সংকটের সমাধান কঠিন হবে। উন্নতি করতে হলে সার্বিক অবকাঠামো, বাজারের বৈচিত্র্য এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সংশ্লেষে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।