অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা: স্বাস্থ্য খাতের অবনতি

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ২:৩১ অপরাহ্ণ, মার্চ ৩১, ২০২৬

স্বাস্থ্য খাতে সেবার মান ও গতি বাড়ানোর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকার। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তারা সরকারের দেড় বছর ক্ষমতায় থাকা সময়ের মধ্যে আগামী প্রজন্মের জন্য স্বাস্থ্যসেবা আরও উন্নত ও accessible করে তুলবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখতে গেলে, সেই স্বপ্ন এখনও অধরা। দুঃখের বিষয়, সরকার তার আত্মপ্রত্যয়ী পরিকল্পনাগুলোর অনেকটাই সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে পারেনি, বরং তাদের সিদ্ধান্তের কারণে এই খাতের দুর্দশা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে, সময়মতো টিকা সরবরাহে ব্যর্থতা দেশের শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ বাড়ানোর পাশাপাশি মৃত্যু ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। শুক্রবারের তথ্যমতে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম হাম শনাক্ত হলে সরকারের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সরকারের গাফিলতিতে সময়মতো টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি, যার ফলে বর্তমানে হামের সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। আরও জানা গেছে, শুরুর দিকে অর্থাৎ জানুয়ারিতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম হাম শনাক্ত হয়, কিন্তু সরকারের জটিলতা ও অবহেলার কারণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া(delay) যায়নি। এর ফলশ্রুতিতে, এখন প্রতিনিয়ত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। তদ্ব্যতীত, সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের সংকট, ওষুধ ও যন্ত্রপাতির অভাব এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও মারাত্মকভাবে প্রকট। এ সব কারণের সম্মিলিত প্রভাবেই দেশের স্বাস্থ্যখাতে অপ্রাপ্তি and অপ্রতুলতা সৃষ্টি হয়েছে, যাতে সাধারণ জনগণকেই পড়তে হচ্ছে অসুবিধার মুখে।

বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার কিছু কাগজে-কলমে অগ্রগতি দেখালেও প্রকৃতিতে কোনও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। সরকারি হাসপাতালে এখনও চিকিৎসক ও জনবল সংকট বিরাজ করছে, ওষুধ ও যন্ত্রপাতির অভাবে চিকিৎসাসেবা মানের মারাত্মক অবনতি হয়েছে। এমনকি স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোও সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি, যার ফলে খাতটি এখনও দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়, স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এই বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে সরব ছিলেন স্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা। গত বছরের ৮ আগস্ট, রাজধানীর মিন্টু রোডের শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন হলে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার সহকারী সায়েদুর রহমান স্বীকার করেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ক্রমাগত মেধা, জ্ঞান ও যোগ্যতার অভাবে ভুগছে। তিনি আরও বলেছিলেন, অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত চিকিৎসা ব্যবস্থা, বিশেষজ্ঞের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, স্বচ্ছতার অভাব এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা এই খাতের গভীর সমস্যা। এছাড়া, স্বাস্থ্যখাতে সংস্কার ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার অভাব, বাজেটের অনিয়ম ও অপ্রতুলতাও উদ্বেগের কারণ। অপ্রতুল এই পরিস্থিতি কাটাতে বেশ কিছু জরুরি সুপারিশও বিষদভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে, এই দুর্বল ও সংকটপূর্ণ অবস্থায় স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন ধীরগতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের সেবা মানোন্নয়ন ও সংস্কারে মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে প্রশাসনিক অচলাবস্থা ও চিকিৎসকদের অসন্তোষ। স্বাস্থ্যের ১৪টি খাতের জন্য বরাদ্দ হয় ওপি (অপারেশন প্ল্যান) এর মাধ্যমে; কিন্তু ২০২৪ সালে রাষ্ট্রের পতনের সঙ্গে সঙ্গে এই পরিকল্পনা বাতিল হলে, প্রায় সব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড থমকে যায়। এর ফলে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান, পুষ্টি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ৩৭টি কর্মসূচি ব্যাহত হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দও কমে গেছে, যা মোট বাজেটের মাত্র ৫ শতাংশ। জনস্বাস্থ্যবিদরা আশঙ্কা করছিলেন, এই অপর্যাপ্ত বরাদ্দের কারণে উন্নয়ন ও সেবা মান উন্নয়নের লক্ষ্যে খুব বেশি অগ্রগতি হবে না। বলা হয়েছে, অন্যান্য সরকারি কর্মকাণ্ডের মত, স্বাস্থ্য খাতে বেশ কিছু কর্মসূচি বাতিল ও স্থগিত করা হয়েছে, যার বেশিরভাগ চালানো হত দাতা সংস্থাগুলোর অগ্রাধিকার অনুসারে।

এদিকে, হাসপাতাল ও ওষুধমালিকা কোম্পানির প্রতিনিধিদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। এর ফলে, ওষুধশিল্পের মালিকরা অভিযোগ করেন, এই নতুন সিদ্ধান্তগুলো শিল্পের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

অপরদিকে, সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের নির্বাচন ও দায়িত্বপ্রাপ্তি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে এসেছে। বিশেষ করে, দেশের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে তাকে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই পদে নিয়োগ দেওয়া হলো, তার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা প্রশ্ন তুলেছেন, এই নিয়োগের পেছনে কি কোনো আদর্শ বা যোগ্যতার বিবেচনা ছিল না? তার মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিরীক্ষণের দাবিও জোরদার হয়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের বর্তমান স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে, অন্তর্বর্তী সরকার অনেকেই সমালোচনা করছেন। তারা বলছেন, এই সময়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং দেশের সব স্তরে চিকিৎসা পরিষেবা উন্নত করা সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞরা আশাবাদী, ভবিষ্যতে পরিকল্পনা ও সঠিক অভ্যন্তরীণ সংস্কারে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন আশা করছেন, কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি বেশ কিছুটা হতাশাজনক।