ব্যাংক নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে আকর্ষণীয় করার আহ্বান এনবিআর চেয়ারম্যানের

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ৭:৩৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ৮, ২০২৬

পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে প্রধান বাধা হিসেবে শুধুমাত্র কর প্রণোদনা বা ইনসেনটিভের অভাবকে দেখছেন না এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। তিনি বলেন, বাজারের মূল সমস্যা অন্য জায়গায় অবস্থিত, যেখানে সমাধান না করলে কেবল প্রণোদনা দিয়েও দীর্ঘমেয়াদে উন্নতি অর্জন সম্ভব হবে না। রোববার (৮ মার্চ) রাজধানীর ফারস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে আয়োজিত “চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড দ্য ওয়ে ফরোয়ার্ড ফর দ্য নিউ গভর্নমেন্ট ইন দ্য স্টক মার্কেট” শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। এই আয়োজনে অংশগ্রহণ করে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরাম (সিএমজেএফ)।

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, “ইনটেনসিভ সমাধান না, আগের মতোই অনেক সময় আমরা অত্যধিক ইনটেনসিভ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি, কিন্তু তাতে কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়নি। বর্তমানে যেখানে স্টক মার্কেটে সাড়ে ৭ শতাংশের মতো কর পার্থক্য রয়েছে, সেখানে সেই অপ্রতুল বা অসংগতির পরিবর্তন খুব বেশি নয়।”

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ও খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। তিনি উল্লেখ করেন, “গত বছর কোম্পানির মূলধনী মুনাফায় কর কমানো হয়েছিল, এর ফলস্বরূপ কয়েক দিন বাজার বেশ ভালো ছিল, তবে পরে আবার আগের মতো অবস্থা ফিরে আসে। সমস্যার মূল কারণ হলো ক্যাপিটাল গেইনে করের স্তর, যা আমাদের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেনি।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা ব্যাংকে টাকা রেখে, বিমায় নীতি গ্রহণ করে এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে মানুষ খরা-ক্লেষে পরিণত হয়েছে। এর পেছনে আমাদের নীতির সত্যিকার ফাঁকগুলো খুঁজে বের করতে হবে। বিশ্বের কোনও অর্থনীতি পুঁজিবাজার ছাড়া এগোতে পারেনি, তাহলে আমাদের কেন নয়? দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ব্যাংকশক্তির উপর বেশি নির্ভর রয়েছে, ফলে উদ্যোক্তারা কেন ব্যাংকটি বেছে নিচ্ছেন, তা বিশ্লেষণ জরুরি।”

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আস্থা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, “তাই বিনিয়োগকারীরা কেন এই বাজারে আসবে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য ব্যাংকের থেকে বেশি লাভের সম্ভাবনাযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা দরকার। সাথে সঙ্গেই, নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকদের চতুর্দিকে নজরদারিতে সুদৃঢ় করে কোম্পানি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তবে বেশিরভাগ তালিকাভুক্ত কোম্পানিই অসৎ বা অর্থলোভী হয়ে পড়ে, যা বিনিয়োগকারীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।”

এছাড়াও তিনি মিউচুয়াল ফান্ডের বিষয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেন। বলেন, “মিউচুয়াল ফান্ডগুলি নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হলেও আমাদের দেশে এর মাধ্যমে বড় অঙ্কের দুর্নীতি ঘটছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য এই পদ্ধতি কতটা নিরাপদ, তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এ খাতে ব্যাপক মনোযোগ ও নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে।” আনুষ্ঠানিকতাকে অতিক্রম করে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন টেকসই করার জন্য ইনটেনসিভের উপর বেশি ভরসা করা ঠিক নয় বলে অভিমত তার।

বিশ্লেষক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির প্রধান প্রতিবন্ধক হলো কর ব্যবস্থা। তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ে, ফলে করের নানা সুবিধা দেওয়া দরকার।” আলোচকরা আরও জানান, গত দুই বছরে কোনও প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বাজারে আসেনি। তিনি মত প্রকাশ করেন, উঁচু কর–প্রণোদনা দিলে বৈচিত্র্য ও উন্নতি সম্ভব, যেমনঃ শ্রীলঙ্কার মতো দেশের ক্ষেত্রে প্রায় ৫০ শতাংশ কর ছাড়ের মাধ্যমে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া যায়।

অন্যদিকে, মো. সাইসুদ্দিন বলেন, “আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি ৫০ বছর হয়ে গেছে, এখনো কেন ইনটেনসিভ নিয়ে ভাবতে হবে? সমস্যা হলে সেটি সিস্টেমে। সমস্যা চিহ্নিত করে কিছু প্রাধান্য দিয়ে, ইনটেনসিভ নয়, সমাধানের দিকে এগোতে হবে।” তিনি আরও সম্মত হন, পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি শক্তিশালী করতে হলে ইকুইটির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ফিক্সড ইনকাম ও কুপন পণ্যে মনোযোগ দিতে হবে, যাতে বাজারে আস্থা বাড়ে এবং বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগকারী অংশগ্রহণ করে।

তিনি এবং অন্যান্য আলোচকরা হিসেবে, এই সেমিনারে অংশ নেন মনির হোসেন, মমিনুল ইসলাম, একে এম হাবিবুর রহমান ও রিয়াদ মাহমুদ। সব মিলিয়ে, আলোচনাগুলো ব্যবসায়ীদের ও বিনিয়োগকারীদের জন্য পুঁজিবাজারের স্থায়িত্ব ও বিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে।