পিলখানা হত্যা মামলায় আসামি হচ্ছেন হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন নেতা

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ১:৫৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি দাবি-দাওয়ার নামে পিলখানায় ঘটে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি, যেখানে তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) বিদ্রোহের সময় ৫৭ সেনা কর্মকর্তা ও মোট ৭৪ জন নিহত হন। এই ঘটনায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা দায়ের হয়, যার মধ্যে একটি হত্যা মামলার রায়ে বিচারিক আদালত ও হাইকোর্ট অভিযুক্তদের দণ্ডাদেশ দিয়েছে। এই মামলাটির আপিল বিভাগে শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে, বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় এখনও সাক্ষ্যগ্রহণের কাজ চলমান।

আইনসূত্রে জানা গেছে, সাক্ষ্যগ্রহণের সময় নতুন করে অনেকের নাম উঠে এসেছে, যারা আগেই চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনসহ একাধিক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী রয়েছেন। আইন অনুযায়ী, এই নামগুলো অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় বিধানও রয়েছে।

মামলার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আড়াইশোরও বেশি আসামির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়, যা দেশের বিচার বিভাগে সর্ববৃহৎ বলে পরিচিত। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর বিচারিক আদালত এ মামলার রায় প্রদান করেন। রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে, ৬১ জন আসামি ইতোমধ্যে মারা গেছেন এবং ২৭৮ জন রায়ে খালাস পান।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন হয়, যা ডেথ রেফারেন্স হিসেবে পরিচিত। এর পরিপ্রেক্ষিতে, ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টের তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রায় দেন, যেখানে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। পাশাপাশি, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন ও ২২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। সব মিলিয়ে, এখন পর্যন্ত ৬১ জন আসামি মারা গেছেন।

আইনসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে হাইকোর্টের রায় ও দণ্ডের বিরুদ্ধে ২২৫ জনের অধিক আসামি অর্থাৎ ৭৩টি পৃথক আপিল ও লিভ টু আপিল দায়ের করেছেন। পাশাপাশি, খালাসপ্রাপ্ত ও সাজা কমানো ব্যক্তিদের নিয়ে ২০টি লিভ টু আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এই আপিলগুলো চলমান এবং আগামী দিনগুলোতে শুনানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এভাবে, ২৪ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের তালিকায় এই মামলার আপিল নম্বর ছিল ৬৬৯।

আসামিপক্ষের একজন আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নবনিযুক্ত প্রধান প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলছেন, ইতোমধ্যে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষ আপিলের সারসংক্ষেপ পেশ করেছেন। এখন এ সব মামলার শুনানি দ্রুততম সময়ে হওয়ার জন্য প্রস্তুত। আদালত এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে এবং আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় থাকা বিষয়গুলো অনুযায়ী শুনানি হবে।

অন্যদিকে, বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলার সাক্ষীর সংখ্যা ১ হাজার ৩৪৪। এ পর্যন্ত ৩০২ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। মামলার বিচার চালিয়ে যাচ্ছে বিশেষ আদালত, যা কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সংলগ্ন। এই মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৮৩৪, যার মধ্যে ৫৯ জন মারা গেছেন এবং ২০ জন পলাতক।

আসামিপক্ষের একজন আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, খালাসপ্রাপ্ত ও বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত প্রায় ৩০০ জন বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের এই মামলায় জামিন পেয়েছেন।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি বোরহান উদ্দিন জানান, এ মামলার পরবর্তী দিন ধার্য হয়েছে বৃহস্পতিবার। তিনি জানান, ইতোমধ্যে ৩০২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের কাজ শেষ হয়েছে।

অপরদিকে, পিলখানা বিদ্রোহের ঘটনায় এই বিস্ফোরক আইনের মামলায় আসামি হিসেবে থাকছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, এবং সাবেক সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ বেশ কিছু আওয়ামী লীগের উজ্জ্বল নেতাকর্মী।

সংশ্লিষ্ট মামলার চিফ প্রসিকিউটর বোরহান উদ্দিন বলেন, সাক্ষ্যপ্রমাণের সময় নতুন অনেকের নাম এসেছে, যারা আগে চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আরও অনেকে উল্লেখযোগ্য। তিনি আরও বলেন, এসব নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া আইনি বিধান অনুসারে করতে পারেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন।

অন্য একজন আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ বলেন, তিনি চান দ্রুত বিচার করা হোক। তিনি আহ্বান করেন, আদালত যেন দ্রুত রায় দেন। তিনি উল্লেখ করেন, মামলার অন্য অংশে জামিন পাওয়া বা সাজা কমানো ব্যক্তিরা রয়েছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিচারিক কাজ সম্পন্ন করতে সরকার ধাপে ধাপে অন্যান্য রোডম্যাপও বাস্তবায়ন করবে। তিনি বলেন, স্বাধীন তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে বেশ কিছু সুপারিশ এসেছে, যা প্রায় ৭০টি। তিনি আরও জানান, পূর্বে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই রিপোর্টের ফলে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যদিও এখন এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্তব্য করে বলেন, পিলখানায় সেনা হত্যাকাণ্ডের বিচার চলছে। তিনি বলেন, এই জটিল মামলার ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু বলতে না পারলেও, এই দুর্ঘটনার পেছনে দেশ ও জনগণের সার্বভৌমত্ববিরোধী অপতৎপরতা ছিল। তিনি মনে করেন, বিভিন্ন প্রকার অপতথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে জনগণের কাছে এখন বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।