স্পেনে অনিয়মিত অভিবাসীদের জন্য বৈধতার নতুন সুযোগ ঘোষণা

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ৩:৪৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬

স্পেনে অনিয়মিত বা নথিপত্রবিহীন অবস্থায় থাকা পাঁচ লাখের বেশি অভিবাসীকে এখন বৈধতার আওতায় আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে স্পেনের সরকার। এই সিদ্ধান্তটি তারুণ্যময় অভিবাসীদের জন্য একটি বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে। তারা এখন এই নিয়মিতকরণ প্রকল্পের জন্য আবেদন প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে, যেহেতু এটির আবেদন প্রক্রিয়া আগামী এপ্রিল থেকে শুরু হবে।

গত ২৭ জানুয়ারি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বে থাকা সোশ্যালিস্ট সরকার মন্ত্রিপরিষদে এই বিশাল ধরনের রায় বা ডিক্রি অনুমোদন দেয়। এর ফলে অনিয়মিত অভিবাসীদের এক বড় অংশের জন্য বৈধ হওয়ার পথ সহজ হয়ে গেছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশ যেমন ইতালি, ফ্রান্স, গ্রিস এবং পর্তুগাল এই ধরনের নিয়মিতকরণের চেষ্টা চালালেও, বর্তমানে ইউরোপজুড়ে এই প্রক্রিয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কঠোর শর্তের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ।

বিশেষ করে, যেখানে অনেক দেশে অভিবাসনবিরোধী নীতিবিরোধী গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, সেখানে স্পেনের এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক শত্রুদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। তবে, প্রধানমন্ত্রী সানচেজ স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, ‘স্পেন মর্যাদা, সহমর্মিতা ও ন্যায়ের পথে এগোতে চায়।’

গত সপ্তাহান্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ৪৬ সেকেন্ডের ভিডিও বার্তায় তিনি ইংরেজি ভাষায় বলেছেন, ‘কেউ কেউ মনে করছেন আমরা স্রোতের বিপরীতে যাচ্ছি। কিন্তু অধিকার দেওয়া বা স্বীকৃতি দিচ্ছি, এই বিষয়গুলো কি চরমপন্থা? সহানুভূতি বা মানবিকতা ব্যতিক্রমী বিষয়?’ সরকার এই ডিক্রির মাধ্যমে তাদের জন্য একটি সুসম ও আইনানুগ জীবনযাত্রার পথ তৈরি করতে চাচ্ছে, যাঁরা ইতোমধ্যে স্পেনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের অংশ।

সানচেজ আরও বলেন, ‘এই মানুষগুলো আমাদের জীবনধারার অঙ্গ। তারা বাজারে, গ্রীন ট্রান্সপোর্ট, স্কুলে সবাই অংশ নিচ্ছেন। তারা আমাদের বাবা-মায়ের দেখাশোনা করেন, মাঠে কাজ করেন এবং দেশের অগ্রগতিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন।’

এই নিয়মিতকরণের পেছনে রয়েছে এক নাগরিক উদ্যোগ, যেখানে সাত লাখের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। ক্যাথলিক চার্চের বড় একটি অংশ এবং প্রায় নয়শ সামাজিক সংগঠন এই উদ্যোগকে সমর্থন দিয়েছে। ২০২৪ সালে সংসদে এই পরিকল্পনা উত্থাপিত হলেও দীর্ঘদিন ঝুলে থাকলেও সম্প্রতি কোয়ালিশনের নীতিতে এই পরিকল্পনা দ্রুত অনুমোদনের পথে এগিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী সানচেজের এই ভূমিকা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে তার এটা বিশ্লেষণ করেছেন, তিনি অভিবাসন ইস্যুতে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ায় ‘অ্যান্টি-ট্রাম্প’ হিসেবে ধরা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি তার এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।

বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীরা এই সিদ্ধান্তে আশান্বিত, কারণ পর্তুগালে নতুন নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় অনেক অভিবাসী ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিলেন। ফলে স্পেনের এই ঘোষণা তাদের জন্য নতুন করে আশার বাতির মতো। ইতোমধ্যে পাকিস্তানিরা তাদের নিজস্ব কনস্যুলেটের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আবেদনপত্রের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ দূতাবাস মাদ্রিদেও পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন শহরে ভ্রাম্যমাণ কনস্যুলার সেবা চালু করেছে যাতে প্রবাসীরা দ্রুত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে পারেন। একই ধরনের কার্যক্রম ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। এই নিয়মিতকরণের মূল লক্ষ্য হলো দীর্ঘদিন ধরে বৈধ কাগজপত্রের অভাবে শ্রম, মৌলিক অধিকার ও জীবনমানের ক্ষতিপূরণে বাধা দেওয়া ব্যক্তিদের জন্য সহজ পথ সৃষ্টি করা।

সরকারি ডেক্রির বিধান অনুযায়ী, আবেদন করতে হলে প্রয়োজন হবে কয়েকটি শর্ত পূরণ করা। আবেদনের জন্য ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ এর আগে স্পেনে প্রবেশের প্রমাণ, অন্তত পাঁচ মাসের নিরবচ্ছিন্ন অবস্থান, এবং ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড না থাকা। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পেতে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা আশ্রয়প্রার্থীরাও এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হবেন। ব্রতী আবেদনকারীদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানরাও সরাসরি পাঁচ বছরের জন্য বৈধ রেসিডেন্স পারমিট পাবেন।

সামাজিক মাধ্যমে দেশভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপে তথ্য ও জিজ্ঞাসার পরিমাণ বাড়ছে। তবে, ভাষাগত দুর্বলতা ও সত্যের অপপ্রয়োগের জন্য কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান বেশি অর্থ আদায় করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এক সাংবাদিক বলেছেন, ‘বৈধতা সংক্রান্ত এই ডিক্রির পর কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এক টাকার কাজে কয়েক গুণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে, যেখানে সাধারণত গ্রাহকরা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা খরচ করেন।’