প্রত্যাশার ভোট আজ

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ৩:৩১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬

আজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই নির্বাচন নতুন এক দিক নির্দেশনা দিচ্ছে। এবার প্রথমবারের মতো একই দিনে ভোটাররা ভোট দেবেন সংসদ সদস্যদের নির্বাচনের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন সংস্কার ও উন্নয়নমূলক প্রশ্নের পক্ষে বা বিপক্ষে রায় দিতে। এই নির্বাচনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই কঠোর যে দেশের ইতিহাসে রাজ্যসভার জন্য এত বিশাল নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়েছে, যেখানে মোতায়েন হয়েছে প্রায় ৯ লাখ পুলিশ ও আধাসেনাসদস্য। সাধারণ মানুষ দীর্ঘ ক্ষণ অপেক্ষা করে, এক নতুন উপলব্ধিতে সরাসরি ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ দেশপ্রেম ও নতুন স্বীকৃতি প্রতি উৎসাহিত।

অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনগুলো বিতর্কের জলে ছিল। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন, ২০১৮ সালে ভোটের রাতে দুর্ব্যবহার ও জালিয়াতির অভিযোগ, আর ২০২৪ সালে এই নির্বাচনকে বিশ্লেষকরা বিবেচনা করছেন একটি ‘আমি-ডামি’ বা অনিয়মের নির্বাচন হিসেবে। প্রথমবারের মতো, নির্বাচনে অংশ নেওয়া অনেক ভোটারই পূর্বের মতো ভোট দিতে পারেননি। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৫ আগস্ট বেগম খালেদা জিয়া সরকারের পতন হয়েছে, এরপরে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় ৮ আগস্ট এবং এক বছরও ন হয়নি, নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এবার একসঙ্গে দুটি ভোটের জন্য প্রচুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলবে এই ভোটগ্রহণ। সংসদ নির্বাচনের জন্য ব্যবহার হবে সাদা ব্যালটপেপার, আর গণভোটের জন্য থাকবে গোলাপি ব্যালট। এইবার অংশ নিচ্ছে ৫০টি দল, যারা মোট ২৯৯টি আসনে ২ হাজার ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ইতিমধ্যে পোস্টাল ভোটের মাধ্যমে সাধারণ ভোটাররা সাড়ে ১১ লাখের বেশি ভোট দিয়েছেন।

রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি; ফলে মূল লড়াই কেন্দ্রীয়ভাবে চলছে বিএনপি ও বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের জোটের মধ্যে। বিএনপি প্রার্থী লড়ছেন ২৮৯টি আসনে, জামায়াত প্রার্থীরা রয়েছেন ২২৮ জন, সঙ্গে রয়েছে অন্যান্য জোটের প্রার্থীরা। রাজধানীর আসনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরম দা’দড়ির বলে মনে করা হচ্ছে। ঢাকা-১৭ ও ঢাকা-১৫ আসনগুলো যেন উঠেপড়ে লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

নির্বাচনে ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি ভোটার অংশ নিচ্ছেন, এর মধ্যে পুরুষরা ৬ কোটি ৪৮ লাখ, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ এবং হিজড়া ব্যক্তিরা ১২৩২ জন। নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, এবার সশরীরে ভোট দেওয়ার জন্য ৪২ হাজার ৬৫৯টি কেন্দ্র প্রস্তুত। পাশাপাশি ২৯৯ কেন্দ্রে পোস্টাল ভোটের গণনা হবে। মোট কেন্দ্রে থাকছে ৪২ হাজার ৯৫৮টি। অংশগ্রহণকারী ৪৫ হাজার ৩৩০ জন পর্যবেক্ষকের মধ্যে ৩৫০ জন বিদেশি। সর্বত্র নজরদারি ও নজরদারির জন্য প্রচুর সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং কর্মকর্তা মিলিয়ে বিপুল সংখ্যক কর্মী দায়িত্বে রয়েছেন।

নির্বাচনের বিশাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংহত করতে সরকারের আট বাহিনী থেকে ৯ লাখের বেশি সদস্য মোতায়েন রয়েছে। পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, আনসার, সেনা, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী ও কোস্ট গার্ড অংশ নিচ্ছেন এই দায়িত্বে। মঙ্গলবার থেকে মাঠে কাজ শুরু করে সেনা ও বিজিবির সদস্যরা, কার্যত পুরো দেশজুড়ে মোতায়েন হয়েছে সুরক্ষা সদস্যরা। ব্যতিক্রম নয়, গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, কক্সবাজার, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী ও খুলনা জেলায় বিশাল টহল টিম থাকছে।

নির্বাচনের জন্য ‘ডিজিটাল প্রহরী’ হিসেবে প্রযুক্তির ব্যবহারে নজর দেয়া হয়েছে একেবারে নতুন দৃষ্টিতে। ‘বডিক্যাম’ বা বডিওর্ন ক্যামেরা এই নির্বাচনের অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি। দেশব্যাপী উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্ৰগুলোতে ২৫৫০০টি ক্যামেরা থাকছে, এর মধ্যে ১৫ হাজার অনলাইনে যুক্ত থাকছে। এই ক্যামেরার মাধ্যমে সরাসরি লাইভ দেখা যাবে। এই ক্যামেরাগুলোর মধ্যে আছে এআই ও ফেস রিকগনিশন সিস্টেম, যা সম্ভাব্য গণ্ডগোল বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির দ্রুত শনাক্ত করে সতর্ক সংকেত পাঠাবে। সংবাদদাতা ও ড্রোন ব্যবহারে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বা ভুয়া খবর ঠেকাতে সার্বক্ষণিক মনিটরিং চালানো হচ্ছে। সন্দেহজনক কনটেন্ট দ্রুত সরানোর জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভোট গণনার প্রক্রিয়াও বিশেষভাবে প্রস্তুত, যেখানে সংসদ ও গণভোটের ব্যালট আলাদা করে গণনা হবে। ফলাফল একে অপরের সঙ্গে মিলিয়ে একসঙ্গে ঘোষণা করা হবে। নির্বাচনের প্রথম দিকে বেশিরভাগ কেন্দ্রের ফলাফল মধ্যরাতের মধ্যে জানা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন নির্বাচন কর্মকর্তারা। পরের দিন ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা ও গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।