অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিস্তৃত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ৩:৩১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬

শেষ মুহূর্তে এসে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার গত সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বিস্তৃত বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসছে; দেশের উপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক হার ১ শতাংশ কমে গেছে। ফলে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্ক হার ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে হাত ছাড়া হচ্ছে দুটি সুবিধা; এই চুক্তির আওতায় দেড় হাজারের বেশি মার্কিন পণ্য বাংলাদেশের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধায় প্রবেশ করবে। এই স্বাক্ষরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এবং বাংলাদেশির বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন স্বাক্ষর করেন।

বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন মনে করেন, এই পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির ফলে বাংলাদেশি পণ্যসম্ভার শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে যাচ্ছে, যা দেশের জন্য লাভজনক। তবে, চুক্তির কিছু শর্ত অত্যন্ত গোপন থাকায় এবং এ সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ পর্যায়ে এটি করা কিছু বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে অনুচিত বলে মনে হয়েছে।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি করে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য, আর আমদানি করে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। যদিও বাণিজ্য ঘাটতি বাংলাদেশের পক্ষে, এই চুক্তি এড়ানোর জন্য নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষত পোশাক তৈরির কাঁচামাল, তুলা ও কৃত্রিম তুলার বাজারে এই চুক্তির গুরুত্ব বেশি।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন, বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এর পাশাপাশি, ওয়াশিংটনে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল দর্শাস্বরূপ যুক্ত হয়, যারা এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন।

চুক্তির আওতায় থাকা বিভিন্ন পণ্যের তালিকা প্রকাশ করে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (ইউএসটিআর)। প্রায় দেড় হাজার মার্কিন পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় বাংলাদেশে প্রবেশ করবে, যার মধ্যে গবাদি পশু, মাংস, মাছ, রাসায়নিক, টেক্সটাইল, যন্ত্রপাতি এবং শিল্পজাত পণ্য রয়েছে। এই পণ্যগুলোর মূল্য আনুমানিক ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এসব পণ্য অন্তর্ভুক্ত থাকছে- জীবন্ত প্রাণী, মাংস ও মাছ, ডিম, দুধ, ফলমূল, সবজি, বাদাম ও ফল, পাশাপাশি রাসায়নিক ও ওষুধ।

এছাড়াও, কৃষিপণ্য, পোশাক ও টেক্সটাইল, যন্ত্রপাতি ও শিল্প সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও নিষ্ক্রিয় সুবিধা পাওয়ার কথা জানানো হয়। ভবিষ্যতে, বাংলাদেশের সরকারি বিমানে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং থেকে ১৪টি বিমান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে, পাশাপাশি জ্বালানি ক্ষেত্রে লিকুইফাইড প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য দীর্ঘ মেয়াদে আমদানির আলোচনা চলছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে রপ্তানি মান বৃদ্ধি ও সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়াতে চুক্তিতে সম্মতি জানানো হয়েছে।

বাণিজ্য চুক্তি সই হওয়ার পর ভারতের উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে, কারণ এতে বাংলাদেশের মার্কিন বাজারে পোশাক ও তুলার রপ্তানি বাড়বে বলে ধারণা। ভারতীয় টেক্সটাইল নীতি পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এতে ভারতের তুলা ও পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা শক্তিশালী হবে। দেশটির কটন টেক্সটাইল এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের বক্তব্য অনুযায়ী, আমদানি সময়, পরিবহন খরচ ও সংরক্ষণ সমস্যা বিবেচনায় বাংলাদেশকে কিছু দীর্ঘমেয়াদী লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে হবে।

চুক্তির স্বাক্ষর শেষে, জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, এটি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম ব্যাপক পরিবেশে একটি স্বাক্ষর। এই চুক্তি বাজার উন্মুক্ত করা, বাণিজ্য বাধা কমানো এবং মার্কিন রপ্তানিকারকদের জন্য সম্ভাবনা বৃদ্ধি করবে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন উল্লেখ করেন, পরবর্তী সরকার চাইলে এই চুক্তি থেকে বের হওয়ার সুবিধা থাকবে। তিনি বলেন, আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৮৫ থেকে ৮৬ শতাংশ রপ্তানি হবে তৈরি পোশাক, যার ওপর শুল্ক শূন্য থাকবে। অন্যদিকে, রপ্তানির ১৫ শতাংশের ওপর ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপিত হতে পারে। এই প্রস্তাবে ব্যবহার করা হয়েছে ‘এপ্লিকেবল নোটিস’ দিয়ে চুক্তি থেকে বের হওয়ার সুযোগ।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য বর্তমান সরকার শেষ মুহূর্তে বেশ কিছু ঝুঁকি নিয়েছে। তারা সতর্ক করে বলছেন, চুক্তির শর্তাবলী স্পষ্ট নয় এবং এতে বাংলাদেশ কতটা উপকৃত হবে—তা নির্ভর করবে স্বচ্ছতার উপর। তাদের মতে, এখনই এই চুক্তির সুবিধা ও ক্ষতি মূল্যায়ন করে পর্যালোচনা দরকার।