বাংলাদেশের নির্বাচনে সম্পর্কের পরীক্ষায় ভারত, কৌশলী চীন

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ৩:৪৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৯, ২০২৬

বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশের নির্বাচন দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে। এই নির্বাচনের প্রভাব যেন শুধু দেশেরই নয়, পুরো অঞ্চলের নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে। বেইজিং এর প্রভাব এখন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে, যেখানে অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশ টানাপড়েনের মধ্যে রয়েছে। এই নির্বাচনের সঙ্গে বর্তমানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানের পর দেশটির প্রথম নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটেছিল। খবর এএফপি’র।

এএফপি জানিয়েছে, প্রত্যর্পণের অনুরোধ সত্ত্বেও শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য ভারতকে দেশের কিছু জাতীয় নেতারা ক্ষুব্ধ মনে করছেন, যেমন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার। এই পরিস্থিতিতে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করা হয়েছে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি এবং এই মুসলিমপ্রধান দেশের বর্তমান শাসনে চীনের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় ছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এখন মূল অংশীদার হিসেবে দিল্লিকে দেখা হয়, যা পরিবর্তনের পথে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের জ্যেষ্ঠ ফেলো জশুয়া কার্লান্টজিক মন্তব্য করেছেন, ‘বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ও ভবিষ্যৎ সরকারের মূল লক্ষ্য এখন চীনের দিকে ঝুঁকছে।’ তিনি যোগ করেন, ‘বাংলাদেশ এখন বঙ্গোপসাগর সম্পর্কিত চীনের কৌশলগত পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে এবং এই সঙ্গে চীন এখন বেশ আত্মবিশ্বাসী।’

উল্লেখ্য, ইউনূসের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর ছিল চীনে, যা এই কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এর পাশাপাশি, গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ও চীন এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যেখানে উত্তরাঞ্চলীয় বিমানঘাঁটির কাছে ড্রোন কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনের ফল যাই হোক না কেন, বাংলাদেশের চীন সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।’

অপরদিকে, শেখ হাসিনার ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা যায়। গত ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অবিরাম বৈরিতা’র অভিযোগ করে এর নিন্দা জানায়। পুলিশ জানায়, ২০২৫ সালে দেশে সংগঠিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় অন্তত ৭০ জন সংখ্যালঘু নিহত হন। ঢাকা এই সহিংসতা নিয়ে ভারতকে দোষারোপ করলেও নির্ঝরে সম্পর্ক মেরামতেও কিছু প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

জানুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন। খালেদা জিয়া বর্তমানে দেশের অন্যতম বড় দলের নেতৃত্বে রয়েছেন। নির্বাচনে জেতালে তাঁর ছেলে, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তারেক রহমানের জন্যও শুভেচ্ছা পাঠান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

তবে, ভারতের হিন্দুত্ববাদী ডানপন্থী গোষ্ঠীর বিক্ষোভের কারণে, এক বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাদ দেওয়া হয়, যার ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এরই জেরে বাংলাদেশের দল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়াও সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উভয় পক্ষই এখন পরিস্থিতি শান্ত ও স্থিতিশীল রাখতে চায়। ডোন্থি বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্কের অস্থিতিশীলতা কমাতে দুই পক্ষই বাস্তববাদী।’ বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির মত, ‘নির্বাচিত সরকার, বিশেষ করে যদি বিএনপি জিতে আসে, তাহলে দুই দেশের সম্পর্কের একটি ধীরস্থির ধারা বজায় থাকতে পারে।’ অন্য এক বিশ্লেষক মনে করেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশ—দু’টো সম্পর্কই একসঙ্গে বিকাশমান হতে পারে, একটির পরিবর্তে অন্যটির জন্য ক্ষতিকারক নয়।’ অন্যদিকে, ঢাকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের এই জমাট বাঁধা অংশটি একদিকে যেমন বাঁধা নয়, তেমনি একই সঙ্গে সম্পর্কের এই শেকড় আরও গভীর হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য সম্পর্কের স্থিতিশীলতা ও কিছু প্রচেষ্টা বাতিলের ঘটনা, যেমন ভারতীয় টাগবোট সম্পর্কিত চুক্তি।

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, চীন বাংলাদেশকে এমন অবকাঠামো সরবরাহ করছে যা ভারত দিতে পারেনি। কিন্তু, ভারতও প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করে যাচ্ছে, যেমন বিদ্যুৎ ও পোশাকশিল্পের জন্য সুতা। বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীন ও ভারত—দু’টোর সম্পর্ক একসঙ্গে বিকশিত হতে পারে। হুমায়ুন কবির উল্লেখ করেছেন, ‘এটি একটি সরাসরি দ্বৈত সম্পর্কের পরিস্থিতি নয়; বরং দুটো সম্পর্কই আলাদাও, একসঙ্গে এরা পারে এগিয়ে যেতে।’