ফুটবল ইতিহাসের কিংবদন্তি রণজিৎ দাশের জীবনাবসান

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ৩:৪৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় সংগ্রামী ও কিংবদন্তি, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের দেশের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক ও সফল অধিনায়ক রণজিৎ দাশ আর নেই। আজ সোমবার সকালে সিলেটের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি চিরতরে না ফেরার দেশের আলোক জগতে পাড়ি জমিয়েছেন। তার বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। তিনি স্ত্রী, চার মেয়ে এবং এক ছেলে সহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার একমাত্র ছেলে রাজীব দাশ। দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলারদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে প্রবীণ ও সম্মানিত một ব্যক্তি।

রণজিৎ দাশের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সিলেটের পুণ্যভূমিতে। স্থানীয় জেলা দলের গোলরক্ষক হিসেবে দক্ষতা দেখানোর পর, তিনি ১৯৫৫ সালে ঢাকার ইস্পাহানি ক্লাবের হয়ে প্রথমবারের মতো ঢাকার শীর্ষ ফুটবল লিগে অভিষেক করেন। তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সফলতা ছিল ১৯৫৮ সালে, যখন তিনি তার দল আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক লিগ শিরোপা জয় করেন—২০১৯৫৮ সালে তাঁর অধীনে এই দল দেশের একমাত্র লিগ শিরোপা জিতেছিল। এছাড়া তিনি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পক্ষেও কিছু সময় খেলেছেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি সাধারণত আজাদ স্পোর্টিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, লিগ জয় ও আগাখান গোল্ডকাপ জয়ের মতো মর্যাদাপূর্ণ আসরে অংশগ্রহণ করেছিলেন। খেলোয়াড়িপনায় থাকাকালীন এবং পরবর্তীতে, তিনি সবসময় এই ক্লাবের একজন শিক্ষামূলক অর্জন হিসেবে থাকতেন।

স্বাধীনতা-পূর্ব যুগে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তিনি এককভাবে প্রথম সারির গোলরক্ষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার উচ্চতা ছিল মাত্র ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি, কিন্তু তার গোলকিপিং দক্ষতা ছিল অবিশ্বাস্যভাবে বিস্ময়কর। তার দ্রুত প্রতিআক্রমণ এবং বল ধরার দক্ষতা আজও ফুটবলের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা। সাবেক জাতীয় ফুটবলার ও কোচ গোলাম সারওয়ার টিপু বারবার বলেছেন, “রণজিৎ দাশের গোলকিপিং দেখলে কেউ বিশ্বাস করবেন না, সে কতটা শৈল্পিক হতে পারে। কম উচ্চতার কারণে তিনি শূন্যে ঝাঁপিয়ে বল তালুবন্দি করতেন, যা সত্যিই অনন্য। তাঁকে তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় দলে ডাকা হলেও, রাজনৈতিক অংগীকারের কারণে তার স্থান পাননি, যা বাঙালি ফুটবলারদের জন্য এক কঠিন বঞ্চনার ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত।

অতীতে ফুটবল ছাড়াও, হকিতে তিনি ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের হকি দলের একজন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং তার আজীবন খেলার অবদান স্বীকৃতি হিসেবে তাঁর বহু পুরষ্কার ও সম্মাননা অর্জন রয়েছে। শেষ বয়সে তিনি শ্রবণশক্তি হারানোর পরও ছিলেন ক্রীড়াঙ্গনের এক অমূল্য রত্ন। সিলেটে তাঁর বাড়িতে ক্রীড়া সাংবাদিকরা নিয়মিত আসতেন, দিন দিন স্মৃতি হাতড়ে তার জীবন ও কর্মের গল্প শুনতেন। গত বছরের ২৫ এপ্রিল, তার বাসভবনে ‘ক্রীড়াঙ্গনে ফেলে আসা দিনগুলো’ শীর্ষক আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি তার দীর্ঘ এবং বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন।

রণজিৎ দাশের অকাল প্রয়াণে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এবং বিভিন্ন সংস্থা তার শোক প্রকাশ করেছে। তার মরদেহ আজ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সিলেটে সমাহিত করা হবে। তার এ চলে যাওয়ায়, তাঁর মতো প্রাচীন ফুটবলপ্রেমী ও কিংবদন্তির শূন্যতা কখনই পূরণ হবে না। মাঠের শৃঙ্খলা, সাহস ও নৈপুণ্যের যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য চিরকাল প্রেরণাদায়ক থাকবেন। তিনি সত্যিই বাংলাদেশ ফুটবল ইতিহাসের এক অনির্বচনীয় কবি ও কিংবদন্তি।