সুন্দরবনের বনজীবীরা বন ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন বিকল্প জীবিকার সন্ধানে Staff Staff Reporter প্রকাশিত: ৩:৩৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০২৬ দস্যু আতঙ্ক, প্রাণহানির আশঙ্কা এবং অনিশ্চিত জীবনের কারণে অনেক সুন্দরবন এলাকার বনজীবি পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। আগে তারা বনগভীরে প্রবেশ করে মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ, মাছ ধরা, কাঁকড়া ও গোলপাতা আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু গত এক বছর ধরে বনদস্যুদের আতঙ্ক ও হামলার কারণে তাঁদের জন্য বেঁচে থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মুক্তিপণের জন্য দস্যুদের প্রকাশ্য হুমকি ও অপহরণ ঠেকাতে তারা এখন পেশা পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকছেন। শরণার্থী হিসেবে সুন্দরবনের শত শত পরিবারের জীবন এখন বিপন্ন। শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুর, আটুলিয়া, কাশিমাড়ী, বুড়ি গোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ, ঈশ্বরীপুর, রমজান নগর ও কৈখালী ইউনিয়নের প্রায় ৫০টি গ্রামে একমাত্র জীবিকা হিসেবে সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল ছিলেন প্রায় ২৫ হাজার পরিবার। তবে এখন বনদস্যু আতঙ্কে অনেকটাই বন যাওয়া বন্ধ করেছেন। বনদর্শকদের মতে, অপহরণের টাকা পরিশোধ করা তাদের জন্য সম্ভব নয়, তাই জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা খুঁজছেন ওই সব মানুষ। প্রথম দিকে ছোটবেলা থেকে সুন্দরবনে মাছ ধরা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন জেলে নুরুজ্জামান গাজী। কিন্তু আজ তিনি বনে যেতে পারেন না, কারণ দস্যুদের ভয়ে। মানসিক ও ভৌগোলিক কারণে পরিবারসহ ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছেন। মোবাইলে কথা হলে তিনি বলেন, ‘জীবনের অর্ধেক সময় আমি সুন্দরবনে মাছ ধরেছি। এখন দস্যুদের ভয়ে বনে যাই না। এলাকায় কর্মসংস্থান না থাকায় ঘরে থাকতে হয়, তাই ঢাকায় এসে একটি ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকের কাজ করছি।’ নুরুজ্জামানের মতোই শ্যামনগর বাসস্ট্যান্ডে দেখা যায় বনজীবি সাফিকুল ইসলামকে। তার সাথে কথা বললে জানান, বনদস্যু আতঙ্কে এখন আর সুন্দরবনে মাছ বা কাঁকড়া ধরতে যেতে পারেন না তিনি। মুক্তিপণের জন্য দিয়েছেন টাকা, তার পরও পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই তিনি এখন বরিশালে দিন মজুরী করে জীবিকা চালাচ্ছেন। অপর এক বনজীবি, আব্দুল করিম (রবি), বললেন, ‘বনে গেলে তো জানি না ফিরে আসতে পারবো কি না। দস্যুরা বন্দুকের মুখে টাকা চায়, না দিলে মারধর করে, অপহরণ করে। একবার মুক্তিপণ দিয়ে বাঁচতে পেরেছি, এরপর আর যেতে চাই না। এখন ইটভাটায় কাজ করি।’ সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া আহরণের জন্য যাওয়া দুজন বনজীবি, আঃ সাঊৎটার ও রমজান আলী, বনদস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনীর হাতে আটক হন। তাদের উপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। তারা দুজন এখন চিকিৎসাধীন। রমজান আলী বলেন, ‘আমি আগে থেকে টাকা পরিশোধ করে বন গিয়েছিলাম, কিন্তু বনদস্যু আমাকে মারধর করেছে। শরীরের বিভিন্ন অংশে লাঠির আঘাত হানে, হুঁশ হারিয়ে যেতে পারি। পরে সহকর্মীদের মাধ্যমে পরিবারের কাছে ফিরে আসি।’ আব্দুল করিমও একই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘আমাকে নৌকায় তুলে নিয়ে প্রচুর মারধর করে। এক রাতে পালিয়ে গুঁড়ো ঝোপের দিকে চলে আসি। শরীরে ব্যথা আর ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাতভর হাঁটা পরে। পরের দিন সন্ধ্যায় একটি ফরেস্ট ক্যাম্পে গিয়ে আশ্রয় নিই। তাদের কাছে গিয়ে ঘটনা জানালে তারা আমাকে উদ্ধার করে।’ জেলেরা জানান, কিছু সুবিধাবাদী বাহিনী আবার দস্যুতায় ফিরে এসেছে, বিশেষ করে পশ্চিম সুন্দরবনে মজনু, শরীফ, দয়াল, রবিউল, দুলাভাই, জাহাঙ্গীর, আবদুল্লাহ, মঞ্জুর, মাসুমসহ আরও বাহিনী সক্রিয়। বন বিভাগ জানায়, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবরে মোট ৩২টি দস্যু বাহিনী থেকে ৩২৮ দস্যু আত্মসমর্পণ করে ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪ রাউন্ড গোলাবারুদ জমা দেয়। সেই সময় সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। তবে দস্যুদের উৎপাতে জেলেরা আগের মতো বনে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে পারছেন না। ফলে এখানকার পেশা কমে গেছে, সরকারের রাজস্বও অনেকটাই কমে গেছে। গত এক মাসে কাশিয়াবাদ স্টেশনের থেকে ৩৬০টি নলীয়ান, ৩১০টি বানিয়াখালী, ও ৩৫০টি কোবাদকসহ অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করে জেলেরা সুন্দরবনে প্রবেশ করেছে। এটি আগের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। স্থানীয় প্রশাসনিক ও সামাজিক নেতারা বলেন, বনদস্যু নির্মূলের জন্য দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। SHARES সারাদেশ বিষয়: