খোলস পাল্টে ভিত গড়ার চেষ্টায় জামায়াত Staff Staff Reporter প্রকাশিত: ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২২, ২০২৬ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সয়দ নির্বাচন ঘিরে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এবার খোলস পাল্টে নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করছে। একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য নিন্দিত এবং এক দশকেরও বেশি নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে থাকা সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থি দলটি নির্বাচন সামনে রেখে দলটি নতুন সমর্থকও টানছে। বিষয়টি উদারপন্থি মহল ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে নারীর অধিকারের প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন না নারী অধিকারকর্মীরা। বুধবার (২১ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য ছেপেছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টের অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ও তার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। এরপর জামায়াত নিজের রাজনীতির নতুন রূপ দেখানোর চেষ্টা করছে। শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় জামায়াত তথাকথিত ‘দুর্নীতিবিরোধী’ ভাবমূর্তি ও ‘কল্যাণমূলক কার্যক্রমের’ পাশাপাশি কিছু বিশ্লেষকে ভাষায় ‘তুলনামূলক অন্তর্ভুক্তিমূলক’ অবস্থানে ভর করে ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফল আশা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) ডিসেম্বরের জরিপে জামায়াতকে অন্যতম ‘পছন্দের’ দল হিসেবে দেখানো হয়েছে। ওই জরিপে বলা হয়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা প্রতিক্রিয়াশীল নই, কল্যাণমূলক রাজনীতি শুরু করেছি।’ তিনি দলের মেডিকেল ক্যাম্প, বন্যা ত্রাণ কার্যক্রম এবং গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কথা উল্লেখ করেন। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ওই বিক্ষোভে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। শফিকুর রহমান বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী এবং এর সহযোগীরা এখন যে গঠনমূলক রাজনীতি করছে, তাতে মানুষ জামায়াতের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখবে।’ ১৯৪০-এর দশকের শুরুতে প্যান-ইসলামিক আন্দোলন থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামীর উৎপত্তি। দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। শেখ হাসিনার শাসনামলে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের বহু শীর্ষ নেতা মৃত্যুদণ্ড পান বা কারাবন্দি হন। যদিও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা আছে। সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় ২০১৩ সালে আদালত দলটিকে নির্বাচন থেকে নিষিদ্ধ করে। সেই নিষেধাজ্ঞা অভ্যুত্থানের পর গত বছর প্রত্যাহার করা হয়। এরপর জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয় পায়। হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের নেতাদের গড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমর্থিত ছাত্র সংগঠনকে পরাজিত করে। কিন্তু কয়েক মাস না যেতেই জামায়াতে সঙ্গেই নির্বাচনী জোট গঠন করেছে এনসিপি। বিশ্লেষকদের মতে, এই জোট জামায়াতের ভাবমূর্তি কিছুটা ‘উজ্জল’ করতে সহায়তা করতে পারে। ঢাকার ব্যস্ত বাজারে ভ্যানগাড়িতে ডাবের পানি বিক্রি করছিলেন ৪০ বছর বয়সী মোহাম্মদ জালাল। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘এবার আমরা নতুন কিছু চাই, আর নতুন বিকল্প হলো জামায়াত। তাদের ভাবমূর্তি পরিষ্কার, তারা দেশের জন্য কাজ করে।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ধর্মতত্ত্ববিদ শাফি মো. মোস্তফা রয়টার্সকে বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে নিপীড়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ জামায়াতকে সুবিধা দিয়েছে। তিনি বলেন, আ.লীগের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা ব্যাপক হতাশা তৈরি করেছে। এর ফলে ‘ইসলামই একমাত্র সমাধান’— এই স্লোগান সামনে এনে জামায়াত নিজেকে ‘নৈতিক বিকল্প’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। এদিকে খোলস বদলের অংশ হিসেবে প্রথম একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে জামায়াত। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিরুদ্ধে মুখেও সোচ্চার দলটি। জামায়াতের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, দলটি ‘ইসলামী মূল্যবোধে পরিচালিত গণতান্ত্রিক’ বাংলাদেশ চায়। নেতারা মুখে নারীদের সমান অধিকারের প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে একটিও নারী প্রার্থী দেয়নি জামায়াত। সংরক্ষিত আসনেই নারীদের প্রতিনিধিত্ব রাখার কথা বলেছেন শফিকুর রহমান। জামায়াত নেতাদের মুখের কল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতিগুলোকে ‘নির্বাচনী কৌশল’ হিসেবে দেখছেন নারী অধিকার সংগঠন নারীপক্ষের নেত্রী শিরীন হক। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘এখন তারা যা-ই বলুক না কেন, ক্ষমতায় গেলে ফিরে যাবে পুরনো মতাদর্শে, যেখানে নারীদের জীবনে পদে পদে বিধিনিষেধ।’ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ২৬ বছর বয়সি উমামা ফাতেমাও জামায়াতের দ্বিচারিতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘একদিন তারা নারী ক্ষমতায়নের কথা বলে, পরদিনই দলের প্রধান বলেন, নারীরা যেন দিনে পাঁচ ঘণ্টা কাজ করে, যাতে পরিবার সামলাতে পারে।’ জামায়াতের মুখপাত্র এহসানুল মাহবুব জুবায়ের রয়টার্সকে বলেন, জামায়াত কখনো ধর্মের নামে সহিংসতা বা অসহিষ্ণুতাকে সমর্থন করেনি। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান তিনি। জামায়াতের অন্যতম প্রার্থী মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান) বলেন, ‘এপ্রিলে জামায়াত আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারা আমাকে তথ্য দেখায়, যেখানে বলা হয় যে—মানুষ পুরনো দলগুলোর ওপর বিরক্ত এবং পরিবর্তন চায়। তারা বিশ্বাস করেছিল সুযোগ আছে—আর তাই আমি যোগ দিই।’ আরমান জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে। শেখ হাসিনার শাসনামলে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মীর কাসেম আলীর ফাঁসি হয়। মীর আহমদ নিজেও ৮ বছর গোপন বন্দিত্বে ছিলেন এবং ২০২৪ সালের আগস্টে মুক্তি পান। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলেন, জামায়াত সরকার গঠন করলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে, যা শেখ হাসিনার সময়ের ভারতকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির বিপরীত হবে। তবে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান এ ধারণা নাকচ করে বলেন, ‘আমরা সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই। কোনো একটি দেশের দিকে ঝুঁকে পড়ার আগ্রহ আমাদের নেই। আমরা সবাইকে সম্মান করি এবং সমতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক চাই।’ SHARES আন্তর্জাতিক বিষয়: