নিপাহ ভাইরাসের কারণে দেশে উদ্বেগ বাড়ছে, খেজুর রসের ঝুঁকি ক্রমশ বৃদ্ধি

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ৩:৩০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০২৬

দেশে নিপাহ ভাইরাসের প্রকোপ আবার নতুন করে নাগরিকদের চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে অনেক גבוה, যা দেশের স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর জন্য বড় সতর্কবার্তা। গত দুই বছরে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত মোট রোগীদের মধ্যে সবকটিই মারা গেছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এছাড়া, অপ্রত্যাশিতভাবে অমৌসুমে সংক্রমণের ঘটনা বেড়েই চলেছে, যার ফলে স্বাস্থ্যবিধি ও নজরদারির গুরুত্ব আরও বাড়ছে। গত বছর আগস্ট মাসে প্রথমবারের মতো নিপাহ শনাক্ত হয় বাংলাদে্ষে, পাশপাশি একজনের মৃত্যু হয়, যা সরকার ও বিশেষজ্ঞদের গভীর ভাবনায় ফেলেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কোভিডের তুলনায় অনেক বেশি। এই পরিস্থিতিতে, খেজুরের রসের অনিয়ন্ত্রিত বিক্রি বন্ধ না করলে বড় ধরনের মহামারি আসার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতকর্তা জারি করেছেন সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

আইনি, রোগতত্ত্ব ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্যে জানা গেছে, ২০০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মোট ৩৪৭ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২৪৯ জনের। শুধু ২০২৪ সালে মারা গিয়েছেন পাঁচজন, আর ২০২৫ সালে মারা গেছে আরও চারজন। অর্থাৎ, শেষ দুই বছরে আক্রান্ত প্রত্যেকেরই মৃত্যু হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে নিপাহ ভাইরাসের মৃত্যুহার গড়ে ৭২ শতাংশ হলেও, বাংলাদেশে পরিস্থিতি ভয়াবহ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আইইডিসিআর বলছে, নিত্যব্যবহার সংক্রান্ত স seasonal মৌসুমের ঐতিহ্য অনুযায়ী ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়কে নিপাহ ভাইরাসের প্রধান মৌসুম ধরা হয়। তবে, ২০২৫ সালের আগস্ট মাসেও এ ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কেবল খেজুরের কাঁচা রসই নয়, সংক্রমণের অন্যান্য উৎসগুলোও থাকতে পারে।

গত বছর প্রথমবারের মতো ভোলা জেলায় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্তের ঘটনা রিপোর্ট হয়, যেখানে আগে কখনো ভাইরাসটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এছাড়া, বাদুড়ের অর্ধ-খাওয়া ফল যেমন- কালোজাম, খেজুর ও আমের মাধ্যমে সরাসরি সংক্রমণের ও প্রমাণ পাওয়া গেছে। দেশের এখনো অজানায় থাকা এই ভাইরাসের অমৌসুমে সংক্রমণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সতর্কতা জোরদার করেন।

আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের মতে, নিপাহ ভাইরাস একটি জুনোটিক রোগ, অর্থাৎ বন্যপ্রাণী বা অন্য প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তাই এই সংক্রমণ রোধে ‘ওয়ান হেলথ’ মডেল অনুসরণ করছে বাংলাদেশ, যেখানে মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণী ও পরিবেশের বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়।

আইইডিসিআরের সংক্রামক রোগ বিভাগের সহকারী বিজ্ঞানী ও নিপাহ জরিপের সমন্বয়কারী ডা. সৈয়দ মঈনুদ্দিন সাত্তার জানান, মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, রস সংগ্রহকারীরা নিরাপদ সংরক্ষণের পদ্ধতি মানছে না। অনেক সময় সংগৃহীত রস খোলা পাত্রে রাখে যা ভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। মানুষ বিশ্বাস করে, কাঁচা রস ফুটিয়ে খেললেই সব সমস্যার সমাধান হয়, কিন্তু সত্যি বলতে এটি ভুল। বর্তমান রসের মৌসুম ছাড়াই সংক্রমণের ঘটনা দেখা যাচ্ছে, যা সচেতনতাকে আরো জোরদার করার দাবি জানায়।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন জানান, ২০০১ থেকে এখন পর্যন্ত ৩৪৭ জন আক্রান্তের মধ্যে ২৪৯ জন মারা গেছেন। এই তথ্যটি স্পষ্ট করে দেয় ভাইরাসটির ভয়ঙ্কর কার্যকারিতা। সম্প্রতি, সংক্রমণের পথ বদলে গেছে বলে ধারণা করছেন তাঁরা। মা থেকে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, যা বোঝায়, বুকের দুধ বা ঘনিষ্ঠ পরিচর্যায় ভাইরাস স্থানান্তর ঘটতে পারে।

অধিক পরিচ্ছন্নতার জন্য, ডা. তাহমিনা অনলাইনে কাঁচা রস বিক্রির বিষয় তুলে ধরে বলেন, এখন রস অনলাইনে কেনা-বেচা হচ্ছে এবং পরিবহনের সময় কম তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই, কম তাপমাত্রায় ভাইরাসটিকে জীবিত রাখা সম্ভব, যার ফলে ঢাকার মতো বড় শহরেও ঝুঁকি বাড়ছে। গ্রাম থেকে শহর— এই বিভাজন আর কার্যকর থাকছে না। ফলে, আমাদের সচেতনতা ও সতর্কতা আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।