গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েলের আবারো হামলা

Staff Staff

Reporter

প্রকাশিত: ৩:৪৪ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩, ২০২৬

আবারও গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনী পৃথক হামলা চালিয়েছে। এই হামলা হয়েছে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের ফলে, যেখানে গুলি চালিয়ে এক ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। উত্তর গাজার জাবালিয়া আল-নাজালা শহরে বৃহস্পতিবার এই ঘটনা ঘটে, যা নিশ্চিত করেছে চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট এক সূত্র। নিহত ওই শিশু বয়সে খুবই কম, মাত্র ১১ বছর। একই দিনে গাজার বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি হামলায় আরও অন্তত চারজন ফিলিস্তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন। গত ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর থাকা এই যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকেই ধারাবাহিক ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে, যা চলমান শান্তি প্রক্রিয়াকে গভীর সংঘর্ষে ফেলে দিয়েছে।

জাবালিয়ায় প্রাণহানির ঘটনাসহ দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরের নেমসাউই কবরস্থানের কাছেও ইসরায়েলি বাহিনী বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করেছে। সেখানে এক শিশু ও এক নারীর সহ আরও চারজন আহত হন, যাদের জরুরি চিকিৎসার জন্য নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। গাজা সরকারের মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বসটন্ত যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৪১৬ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১,১১০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই দুই বছর ব্যাপী সংঘাতে নিহতের সংখ্যা এখন ৭১,০০০ ছাড়িয়েছে, যার বড় অংশই নারী ও শিশু। আহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি।

অপরদিকে, ইসরায়েলি হামলার পাশাপাশি গাজা গভীর মানবিক সংকটে পড়ে গেছে। গাজার আল-দারাজ এলাকার আল-ইয়ারমুক আশ্রয়শিবিরে গত রাতে একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একজন মা ও তার শিশুর মৃত্যু হয়। বর্ধিত হামলার ফলে অধিকাংশ বাড়ি হারিয়ে ফেলা গাজা এখন ক্ষতিগ্রস্ত ত্রাণ শিবিরে বাস করছে লাখো মানুষ। জটিল পরিস্থিতিতে, তীব্র জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎবিহীন পরিস্থিতির কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেড়েই চলেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে।

নেতানিয়াহুর গাজায় যুদ্ধবিরতি না চানোর কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- তিনি উল্লেখযোগ্য চাপের মধ্যেও থাকছেন। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকে তিনি আলোচনায় উঠে এসেছেন শক্তভাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ‘বীর’ বলে আখ্যায়িত করে বলেছেন, নেতানিয়াহু তাঁর পরিকল্পনাগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছেন। তবে, কিছু মার্কিন কর্মকর্তা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, নেতানিয়াহু আসলে ধীরগতিতে এগোচ্ছেন যাতে করে আন্তর্জাতিক চাপ কমে যায় এবং তিনি ভবিষ্যতে আবার যুদ্ধ শুরু করার সুযোগ পান।

প্রত্যাশিত ছিল যে, যুদ্ধবিরতি শর্ত অনুযায়ী সব জিম্মি বিষয়, ত্রাণ ও সহায়তা প্রবেশের জন্য দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা হবে। তবে নেতানিয়াহু এখনো গাজায় ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দিচ্ছেন। তার দাবি, হামাসের সমস্ত জিম্মির মরদেহ ফেরত না এ পর্যন্ত, তবেই তিনি দ্বিতীয় ধাপে যেতে রাজি নন। এছাড়া, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ও হামাসকে নিরস্ত্র করতেও তিনি অঙ্গীকার করছেন না। এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, নেতানিয়াহু কি ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধবিরতি দুইয়ের দ্বিতীয় ধাপে যেতে চান না? কেন তিনি এই পরিস্থিতি বজায় রাখতে চাচ্ছেন? এর পেছনে চারটি মূল কারণ উঠে এসেছে।

প্রথমত, কট্টর দক্ষিণপন্থী অর্থাৎ প্রচণ্ড অভুতপূর্ব রাজনীতির জন্য তিনি সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আরও শক্তভাবে থাকছেন। এই রাজনৈতিক দিশানির্দেশে, তার কট্টরপন্থি জোট সরকার ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর দক্ষিণপন্থী সরকার। যুদ্ধের সময় এই গোষ্ঠীগুলোর চাপেই তিনি এই অবস্থানে আছেন। এমনকি, কিছু কট্টরপন্থি মন্ত্রী গাজায় অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের দাবি জানিয়ে থাকেন। বেশিরভাগ নেতারা ইসরায়েলি বাহিনীকে গাজায় থাকতে চান এবং আরও ইহুদি বসতি স্থাপন করার পরিকল্পনা করছেন।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাহিনী গাজায় মোতায়েন হলে ইসরায়েলি সামরিক কার্যক্রমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হবে। আন্তর্জাতিক বাহিনী থাকলে হামলা ও অভিযান কঠিন হবে কারণ, এতে গাজার পরিস্থিতি অনেক বেশি আন্তর্জাতিকীকরণ হবে। এছাড়া, গাজায় হামরা চলমান আরও দমন-পীড়ন এবং মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। নেতানিয়াহুর জন্য এই বিষয়গুলো পছন্দ নাও হতে পারে, কারণ এতে তার কৌশলগত স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে, সেসময় গাজায় শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা তার জন্য জরুরি। এর ফলে, উপযুক্ত কূটনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে। এক বিশ্লেষক বলেছেন, নেতানিয়াহু যদি বিদেশি সেনা গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেন, তাহলে তার কার্যক্রমের স্বাধীনতা অনেকখানি ক্ষুণ্ণ হবে। সে জন্য তিনি পরিস্থিতি এই রেখায় রাখতে চান।